সিজন চেঞ্জের সময় আমাদের সর্দি কেন হয় ?

সিজন চেঞ্জের সময় আমাদের সর্দি কেন হয় ?

সর্দি খুবই সাধারণ একটি শারীরিক এবং সাময়িক অসুবিধার ব্যাপার। প্রায় প্রত্যেকেই বছরে একাধিকবার সর্দিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই শব্দটি এসেছে ফার্সি শব্দ থেকে , যার অর্থ ‘ ঠাণ্ডা ভাব ‘ । এর জন্য মূল দায়ী  রাইনোভাইরাস প্রথম আবিষ্কার করেন   ডঃ উইন্টসন প্রাইস , জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৫৬ সালে। আমরা এই নিবন্ধে ভাইরাল ইনফেকশন সর্দি সম্মন্ধে আলোচনা করব। এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় গুলি হল :

  • সর্দি কি? ( What is a cold? )
  • সর্দি কিভাবে হয় ? ( How is the cold? )
  • সর্দিতে কি কি উপসর্গ দেখা যায় ? ( What are the symptoms of a cold? )
  • ইনফ্লুয়েঞ্জার উপসর্গ গুলি কি কি ? ( What are the symptoms of influenza? )
  • সর্দি ঘরোয়া উপায়ে কিভাবে সারাবেন ? ( How to cure colds at home? )
  • ঘন ঘন সর্দি কেন হয় ? ( Why is there frequent colds? )
  • সর্দির হাত থেকে বাঁচতে কি করবেন ? ( What to do to survive the cold? )
  • বাচ্চাদের সর্দি হলে কি করবেন ? ( What to do if children have a cold? )

সর্দি কি ? 

সর্দি কি জানতে হলে প্রথমে জানতে হবে আমাদের মিউকাস বা শ্লেষ্মা কি ?

সর্দি হলে আমাদের নাসারন্ধ্রের বাইরে যে আঠালো তরল পদার্থ বেরিয়ে আসে সেটা হল মূলত মিউকাস।

মিউকাস বা শ্লেষ্মা  হল এক ধরনের ভাসমান পিচ্ছিল তরল জাতীয় আস্তরণ। যা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শ্বাসনালী , পোষ্টিকতন্ত্র ও অন্যান্য অংশ থেকে নিঃসৃত হয়। 

শ্লেষ্মা মূলত ৯৫% জল বাকি ১৫% লিপিড ,প্রোটিন ,DNA , গ্লাইকোপ্রোটিন , প্রোটিন এবং গ্লোবলেট কোষ  এবং প্রোটিনোগ্লাইকেন উপাদান  থাকে ।

শ্লেষ্মা নাক এবং শ্বাসনালী আর্দ্র রাখে , যাতে শুকিয়ে না যায়। নাকের ভেতরের পাতলা চামড়া শুকিয়ে গেলে নাক জ্বালা করবে , নাকে অস্বস্তি হবে , নাকে চুলকানি হবে এবং নাক দিয়ে রক্ত পড়বে।

তাছাড়া আমরা যখন নিঃশ্বাস গ্রহণ করি ,বাতাসে ভাসমান বিভিন্ন ক্ষতিকারক ভাইরাস , ব্যাকটেরিয়া , জীবাণু , দূষিত ধোঁয়া , ধুলো ময়লা ও অন্যান্য উপাদান থাকে। শ্লেষ্মা এইসব ক্ষতিকারক  উপাদানগুলোকে আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে দেয় না । যা থেকে আমাদের শরীর জটিল থেকে জটিলতর রোগ থেকে মুক্ত থাকে।

কোনো কারণে এইসব ক্ষতিকারক  জীবাণু ,ব্যাকটিরিয়া বা  ভাইরাসের আক্রমণ ঠেকাতে শ্লেষ্মা ব্যর্থ হলে এরা শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে শ্লেষ্মা র নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয় । তখন সেই মিউকাস নাসিকা রন্ধ্র দিয়ে বেরিয়ে আসে । ফলত নাক বন্ধ হয়ে যায় , নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় , নাক দিয়ে জল বেরিয়ে আসে যাকে সর্দি বা কমন কোল্ড বলা হয়।

 সিজন চেঞ্জের সময় মূলত শীতকালে ঠাণ্ডা লেগে সর্দির প্রকোপ বেশি দেখা যায়। সর্দিতে সাধারণত নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে জল (মিউকাস ) বেরিয়ে আসার  সমস্যা দেখা যায়।  এই সমস্যা ৭-১০ দিন বা কারো কারো ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে তাহলে সাইনুসাইটিস  হওয়ার সম্ভাবনা অধিক বেড়ে যায়।

সর্দি কিভাবে হয় ?

সর্দি

সর্দির সংক্রমণের জন্য দুশোর অধিক ভাইরাস আছে , তার মধ্যে অন্যতম হল রাইনোভাইরাস । 

বেশিরভাগ ঠাণ্ডাজনিত সর্দি রাইনোভাইরাস এর কারণে হয়ে থাকে। এইসব ক্ষতিকর ভাইরাস গুলো আমাদের নিশ্বাসের সঙ্গে নাকের ভিতর জমা হয়। ভাইরাস কণিকাগুলো নাকের ভিতরের adenoid নামক স্থানে প্রবেশ করে অনুনাসিক কোষ পৃষ্ঠের উপর অবস্থিত রিসেপ্টর (ICAM 1) এর সাথে যুক্ত হয়। ভাইরাসকণিকাগুলো অনুনাসিক কোষ পৃষ্ঠের উপর অবস্থিত রিসেপ্টর (ICAM 1) এর সাথে যুক্ত হয়। এই রিসেপ্টর ভাইরাস পৃষ্ঠের উপর ডকিং পোর্ট নামক অংশের সাথে মিশে ভাইরাস কণিকাগুলো একটি কোষের মধ্যে সংক্রমণ হওয়া শুরু করে।  সংক্রমিত কোষগুলো নতুন ভাইরাস কণিকা উৎপন্ন করে এবং পুরোনো সংক্রমিত কোষগুলির মৃত্যু ঘটে। এভাবে নতুন কোষে ভাইরাস সংক্রমন ঘটিয়ে এবং নতুন নতুন ভাইরাসের কণিকা উৎপাদন এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে । যার ফলে আমরা সর্দি হয়।

এছাড়াও অনেকের কান্নার সময়  সর্দি  হয় , আবার কান্না থামলে সর্দি চলে যায়।

সর্দিতে কি কি শারীরিক উপসর্গ দেখা যায় ? 

ভাইরাস জনিত

  • সর্দিতে হলে নাক বন্ধ হয়ে থাকে , ফলে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় । কোনো কিছুর ঘ্রাণ পাওয়া যায় না।
  • নাক দিয়ে শ্লেষ্মা বাইরে বেরিয়ে আসে।
  • হাঁচি হয় , কখনো কখনো কাশি হয়।
  • গলা খুসখুস ভাব  থাকে , আবার গলা ব্যথাও হতে পারে ।
  • খুব সামান্য জ্বর থাকতেও পারে আবার নাও পারে । ধীরে ধীরে জ্বর আসে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু জনিত সর্দি

ফ্লু এর উপসর্গ সাধারণ সর্দির মতই হয় কিন্তু দ্রুত চিকিৎসা না করলে মারাত্বক প্রভাব হতে পারে এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ভারত , বাংলাদেশের মত দেশ গুলিতে বর্ষাকালে এবং শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ বেশি দেখা যায়। 

 ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের সমীক্ষায় দেখা প্রতিবছর সারাবিশ্বে ফ্লু তে আক্রান্ত হয়ে তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষ মারা যায় ।

  • শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করে  ১০০ ডিগ্রীর ওপরে চলে গিয়ে তীব্র জ্বর আসে।
  • হঠাৎ করে শরীরে প্রচণ্ড ক্লান্তি আসে সাথে শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে।

যাদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাঁপানি জনিত সমস্যা বা ক্যান্সারের মত জটিল রোগ আছে তাদের ক্ষেত্রে সাধারণ ফ্লু’য়ের সমস্যাও মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে।

ফ্লু তে আক্রান্ত হলে যত সম্ভব ঠাণ্ডা থেকে দূরে থাকুন। এইসময় নিজেকে উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্যে রাখা খুবই প্রয়োজন তার সাথে  পরিমিত বিশ্রাম এবং পর্যাপ্ত ঘুম ফ্লু থেকে সহজেই আরোগ্য লাভ করতে সাহায্য করে।

ফ্লু তে জ্বরের তীব্রতা কমাতে প্যারাসিটামল , প্রচুর পরিমাণে জল ও তরল জাতীয় খাবার খান। সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

এছাড়াও, ফ্লু আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার্য বাসনপত্র , গ্লাস ইত্যাদি থেকে সংক্রমণ ঘটার আশঙ্কা থাকে। তাই এগুলি ব্যবহার করার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।

 সর্দি কতদিন থাকে ?

ভাইরাস গঠিত  সর্দি সাধারণত ৭-১০ দিন থাকে , আবার কারো কারো ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে ।

ঘন ঘন সর্দি হওয়ার কারণ কি ?

 যাদের তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম , বাচ্চাদের এবং বয়স্কদের ঘন ঘন সর্দি হয়। যাদের শরীর দূর্বল রাইনোভাইরাস সহজেই আক্রমণ করে ফেলতে  পারে , ফলে ঘন ঘন সর্দি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সর্দির জন্য রাইনোভাইরাস দায়ী থাকে। অন্যান্য রোগের ভাইরাসের ক্ষেত্রে প্রতিষেধক টিকা নিয়ে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। কিন্তু রাইনোভাইরাসের বিভিন্ন রকম আকৃতি ও আক্রমণ ক্ষমতাও বিভিন্ন রকমের। সেক্ষেত্রে প্রতিটি আলাদা আলাদা ধরনের ভাইরাসের অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা করা অ্যান্টিবডি তৈরী করতে হবে ,যা কোনো একটি প্রতিষেধক টিকার মধ্যে করা সম্ভব নয় । তাই রাইনোভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক টিকা নেই। তাই রাইনোভাইরাস গঠিত সর্দিতে আক্রান্ত হয় অধিক।

তবে সাধারণত প্রাপ্ত বয়স্করা বছরে ২ থেকে ৩ বার সর্দিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে । আর ছোটো বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বছরে ৬ থেকে ৮ বার পর্যন্ত সর্দিতে আক্রান্ত হতে পারে , শীতকালে সর্দিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রকোপ বেশি দেখা যায়।

সর্দি ঘরোয়া উপায়ে কিভাবে নির্মূল করবেন ?

সর্দি বা কমন কোল্ড খুবই সাধারণ ব্যপার। এটি সাধারণত কিছুদিন পর নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায় । তবে সর্দি কালীন সাময়িক কিছু শারীরিক অসুবিধা থাকে যেগুলি সহজেই কিছু নিয়ম স্বাস্থ্য বিধি ও ঘরোয়া উপায়ে নির্মূল করা সম্ভব।

নিয়মিত স্নান করুন , পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন

 যেহেতু ঠাণ্ডা লেগে সর্দি হয় ,তাই অনেকে স্নান করতে চান না । এটা করবেন না , সর্দি যেহেতু ভাইরাস জনিত কারণে হয় তাই এইসময় নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি।  তাছাড়া মাথায় স্নান না করলে সর্দি বসে যায়। তাই সময় মত সকাল সকাল ঈষদ্ উষ্ণ জলে স্নান করে রোদে চুল শুকিয়ে নিন । সর্দি নিয়ন্ত্রণে থাকবে ।

দারুচিনির ব্যবহার

১ কাপ গরম জলে পরিমাণ মত দারুচিনি গুঁড়ো এক চিমটে গোলমরিচের গুঁড়ো ও মধু মিশিয়ে খান । সারাদিনে এই মিশ্রণটা অন্তত দুবার বানিয়ে খেতে পারলে সর্দিতে ভালো ফল পাবেন । দারুচিনিতে ভাইরাস ও ব্যাকটিরিয়া নাশক উপাদান আছে যা সর্দির দারুন কার্যকারী।

লবঙ্গের ব্যবহার

 সর্দিতে নাক বন্ধ হয়ে যায় । নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় । কোনো কিছুর গন্ধ পাওয়া যায় না। এইরকম হলে লবঙ্গ চিবিয়ে খান , লবঙ্গ তে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। যা নাক বন্ধ থাকা অবস্থায় নিঃশ্বাসের সজীবতা দিতে পারে ।

কালোজিরা ব্যবহার করুন

কালোজিরা কে (Fennel flower) একমাত্র মৃত্যু ছাড়া সব রোগের অব্যর্থ ওষুধ বলা হয় । তাই কালোজিরা কে খাদ্য না বলে পথ্য বলা হয় । যেকোনো রোগ সারাতে কালোজিরা দারুন কার্যকারী।

১ চামচ কালোজিরা তেলের সাথে  ২ চামচ তুলসী পাতার রস , ও  ৩ চামচ মধু ভালো করে  মিশিয়ে খান  সর্দি তো দূর হবেই সাথে অন্যান্য উপসর্গ কাশি , গলা ব্যথা , জ্বর সব দূর হয়ে যাবে। তাছাড়া যদি বুকে সর্দি বসে থাকে কালোজিরার তেল গরম করে বুকে পিঠে মালিশ  করুন।

দুধের সাথে কাঁচা হলুদের মিশ্রণ

এক গ্লাস দুধের মধ্যে আধ থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণ মত কাঁচা হলুদ খোসা ছাড়িয়ে ভালো করে  থেঁতো করে নিন। এবার ওই থেঁতো করা হলুদ দুধের সাথে মিশিয়ে ভালো করে গরম করে নিন। দুধ ঠাণ্ডা হয়ে এলে হালকা গরম থাকা অবস্থায় খেয়ে নিন। সর্দি সাথে গলা খুসখুস ভাব এ ভালো ফল পাবেন ।

গরম জলের ভেপার নিন 

সর্দির ফলে মাথা ধরা , কপাল ব্যথা , নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট প্রভৃতি সব উপসর্গে গরম জলের ভ্যাপার সব চেয়ে বেশি কার্যকরী। একটি বড় পাত্রে জল ফুটিয়ে নিয়ে মুখ মাথা ভালো করে তোয়ালে দিয়ে ঢেকে এবার গরম জলের মধ্যে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিন। প্রথমে কষ্ট হবে কিন্তু গরম জলের ভেপার ম্যাজিকের মত কার্যকারী। ভেতর থেকে জমে থাকা কফ বের করে দেবে। ভেপার নেওয়ার ট্যাবলেট  পাওয়া যায় ,ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সেটা নিয়ে ফুটন্ত জলে ফেলে দিয়ে এবার ভেপার নিন , না হলে ফুটন্ত জলে খানিকটা  ভিস্ক ভেপুরাব জেল ফেলে দিয়ে  ভেপার নিন । একই কাজ দেবে । নিমেষের মধ্যে মাথা ধরা , মাথা ব্যথা , নাক বন্ধ সব ঠিক হয়ে যাবে। 

পেয়াজ ব্যবহার করুন

পেয়াজ পাতলা স্লাইস করে কেটে পায়ের তলায় রেখে মোজা পড়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।

সর্দিতে মুখের স্বাদ ফেরাতে কি খাবেন ?

টমেটোর স্যুপ বানিয়ে খান

 সর্দি হলে মুখের স্বাদ থাকে না , খেতে ইচ্ছে করে না  সেক্ষেত্রে গরম গরম টমেটোর স্যুপ মুখের স্বাদ ফিরিয়ে আনবে। একটা গোটা টমেটো , বড় বড় ২ কোয়া রসুন ও লেবুর রস মিশিয়ে স্যুপ বানিয়ে খান । গলা ব্যথায় আরাম পাবেন।  রসুন শরীরকে ভেতর থেকে গরম রাখতে সাহায্য করে ,ফলে সহজেই বাইরের ঠাণ্ডা চট করে শরীরকে কাবু করতে পারে না । তাছাড়াও  রসুনে অ্যালিসিন নামক উপাদান থাকে যা ক্ষতিকারক ব্যাকটিরিয়া নাশ করতে সাহায্য করে।

সর্দির হাত থেকে বাঁচতে কি করবেন ?

ঠাণ্ডা লাগা জনিত কারণে সর্দি হয়ে থাকে।  সর্দি মূলত ভাইরাল ইনফেকশন। এটি ছোঁয়াচে সর্দিতে আক্রান্ত হলে বার বার ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে । হাত না ধুয়ে চোখ , নাক , মুখে হাত দেওয়া যাবে না । হাঁচি কাশি হলে পরিষ্কার রুমাল ব্যবহার করুন ,যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।

ভাইরাস বাতাস দ্বারা বাহিত হওয়ার জন্য সর্দিতে আক্রান্ত রোগীর হাঁচি কাশি থেকে দূরে থাকুন। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি , কাশি , নাক মোছার পর হাত সাবান দিয়ে না ধুয়ে কোনও বস্তু ধরলে সেখানে ভাইরাস লেগে থাকতে পারে পরবর্তীকালে সেই বস্তুটি হাতে ধরে পরবর্তীতে মুখে বা নাকে হাত দিলে ভাইরাস পরোক্ষভাবে আক্রমণ করতে পারে।

এছাড়াও হাঁচি কাশির সময় মুখ না ঢাকলে ও সংক্রমণ ছড়ায় । ওই স্থানে অপর ব্যক্তি থাকলে সে‌ থেকে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে ।

বাচ্চাদের সর্দি কেন বেশি হয় ?

শীতের শুরুতেই ,সিজন চেঞ্জের সময় বেশি ঠাণ্ডা লেগে সর্দি হয় । পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে বাচ্চারা সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে না ফলে ঠান্ডা লেগে যায়। বাচ্চাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কম থাকার জন্য সহজেই ভাইরাস আক্রমণ করার ফলে সর্দি হয় ।

সর্দি খুবই সাধারণ ব্যপার , এটা নিজের থেকেই সেরে যায় বেশিরভাগ , এইভাবে ধীরে ধীরে বাচ্চার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তবে সর্দির সাথে অন্যান্য উপসর্গগুলি খেয়াল রাখতে হবে। সর্দিতে মুখের স্বাদ থাকে না বলে সাধারণত কম খেয়ে থাকে । 

কিন্তু যদি খাওয়াদাওয়া প্রায় ৬০-৭০% কমে যায় , নিঃশ্বাস নিতে অনবরত কষ্ট হয়, পেট ওঠা নামা করে , সাথে অধিক তাপমাত্রায় জ্বর থাকে সেক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এগুলি সাধারণ সর্দির লক্ষণ না , এগুলো ফ্লু  র লক্ষণ । ফ্লু তে ডাক্তারের চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।

বাচ্চার সর্দি হলে কি করবেন ?

আরামদায়ক পোশাক পরান

বাচ্চার একটু ঠান্ডা লাগলেই বাচ্চার মাথায় হনুমানকে টুপি থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত মোজা দিয়ে সবসময় ঢেকে রাখবেন না ।  এতে বাচ্চা ঘেমে অহেতুক কষ্ট পায় , সাথে মাথায় গলায় ঘাড়ে ঘাম জমে অধিক ঠাণ্ডা লাগে । তাই বাচ্চার পোশাকের সাথে আরামের দিকটা খেয়াল রাখবেন। অনেক বাচ্চায় হনুমান টুপি পড়তে চায় না , কান্নাকাটি করে এই অবস্থায় জোর করে টুপি মাথায় গলিয়ে দেবেন না । কান্নাকাটি করার সময় মাথায় ঘাম হয় অনেক বাচ্চার । তার উপর টুপি চাপিয়ে দিলে ঘামটা জমেই রয়ে যায় যা থেকে অধিক ঠাণ্ডা লাগে।

নিয়মিত স্নান করান 

ঠাণ্ডাজনিত কারণে সর্দি হলেও বাচ্চাকে প্রতিদিন ঈষদ্ ঊষ্ণ জলে সাবান মাখিয়ে জলের মধ্যে অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড দিয়ে স্নান করান । গা মাথা শুকনো করে মুছিয়ে পরিষ্কার জামাকাপড় পরান । বাচ্চাকে স্নান করালে শরীর ও চনমনে থাকে , ভাইরাসের অধিক বাড়বাড়ন্ত হবে না।

 বাচ্চার সাথে সবসময় রাখতে পরিষ্কার রুমাল দিন যাতে হাঁচি , কাশি , নাক দিয়ে জল গড়ালে ব্যবহার করতে পারে । বাচ্চারা বাইরে ধুলো ময়লাতে খেলা করে , অন্য বাচ্চাদের সাথে মেশে সেখান থেকে ভাইরাসের অধিক সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাইরে থেকে বাড়ি এলে হাত পা সাবান দিয়ে ধুইয়ে জামা কাপড় বদলিয়ে ফেলুন।

পরিমিত পরিমাণে জল খাওয়ান

শীতকালে ঠান্ডায় সর্দি হলে বাচ্চারা জল খেতে চায় না । খেয়াল রাখবেন, যাতে আপনার বাচ্চা যেন পরিমাণ মতো জল খায়। সর্দি হলে নাক দিয়ে শ্লেষ্মা বাইরে বেরিয়ে আসে। আর এই শ্লেষ্মার অধিকাংশই জল। ফলে , সর্দি হলে শরীর অনেকটাই শুকিয়ে যায়। সর্দি হলে বাচ্চার শরীর ডিহাইড্রেশন ও কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ঠাণ্ডা জল খেতে না চাইলে কুসুম কুদুম গরম জল করে বাচ্চাকে খাওয়ান । যাতে শরীরে জলের অভাব না হয়।

রসুন দেওয়া সর্ষের তেলের মালিশ 

একটা পরিষ্কার পাত্রে পরিমাণ মতো সর্ষের তেল নিয়ে তার মধ্যে কয়েকটি রসুনের কোয়া থেঁতো করে আগুনে ভালো করে গরম করে নিন। রসুনের রঙ পাল্টে কালচে হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন । এবার আগুন থেকে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে অল্প গরম থাকা অবস্থায় বাচ্চার বুকে , পিঠে ,পায়ের তলায়, হাতের তালুতে ১০-১৫ মিনিট ভালো করে রাতে ঘুমনোর আগে মালিশ করে দিন। সর্দিতে আরাম পাবে। একটু তেল নিয়ে বাচ্চার নাকের সামনে ধরুন , রসুনের ঝাঁঝালো গন্ধ নাকের মিউকাস পাতলা করে দেয়। এতে সর্দির সময় বন্ধ নাক খুলে যাবে।

তালমিছরি 

বাচ্চাদের ছোটো থেকেই তালমিছরি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে ভিটামিন B1 , B2 ,B3 ,B6 , B12 প্রভৃতি সব উপাদান থাকে । যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এছাড়াও সর্দি-কাশি গলাব্যথা  সবেতেই কাজ দেয় তালমিছরি । সর্দি কাশি হলে বাচ্চাদের তালমিছরি খাওয়ান।

টকদই খাওয়ান

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে খাওয়া দাওয়ার প্রতি সচেতন হোন। প্রতিদিন টকদই খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

টকদই এ ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক, ভিটামিন B2, ভিটামিন B12 প্রভৃতি সব উপাদান থাকে যা রোগের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে। বাচ্চাকে  প্রতিদিন  টক দই খাওয়ানোর অভ্যাস করুন । এতে বাচ্চার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

মাশরুম খাওয়ান

প্রতিদিনের  খাবারের মেনুতে মাশরুম রাখুন। এতে ভিটামিন B এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে । যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সাথে ভাইরাসজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় ।

বাচ্চাদের সিজন চেঞ্জের সময় সর্দি হলে বিরক্ত হবেন না , আদর যত্ন নিন । পরিবারের সন্নিধ্যে আদরে এমনিতেই বাচ্চা সুস্থ হয়ে উঠবে। 

তথ্যসূত্র

কোরা ,আনন্দবাজার পত্রিকা,গুগল ,উইকিপিডিয়া,বিবিসি নিউজ , healthline.com , medical news today , ফেসবুক ও অন্যান্য

Leave a Reply