রক্তদান কেনো করবেন ?

রক্তদান করুন,অন্যের জীবন বাঁচান

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। আদিমকালে বিভিন্ন প্রতিকূলতার হাত থেকে রক্ষাপেতে ,এবং প্রয়োজন বুঝে মানব প্রজাতি একসাথে দলবদ্ধ ভাবে থাকতে শুরু করে। প্রয়োজনে মানবজাতি একে-অপরের সাহায্য করে থাকে , এইভাবেই বহুপ্রজন্মধরে মানব প্রজাতি পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।

রক্তদান এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া।একমাত্র মানুষই পারে মানুষের এই প্রয়োজন মেটাতে। তাই, মানবজাতির স্বার্থে রক্তদান করুন। অন্যের জীবন বাঁচান।রক্তদান অতিপ্রয়োজনীয় একটি কর্মসূচি। এইনিবন্ধে রক্তদান কি এবং এর কি প্রয়োজন এ সম্মন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করব।

  • রক্তদানের ইতিহাস ( History of blood donation in Bangla )
  • রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা কি ? (What are the requirements for blood donation? in Bangla )
  • গোল্ডেন ব্লাড বা বিরলতম রক্ত কি? ( What is the Golden Blood? in Bangla )
  • পিরিয়ড চলাকালীন মহিলাদের রক্তদান করা উচিত কিনা ? ( Should women donate blood during the period? in Bangla )
  • রক্তদান করলে রক্তদাতার কি উপকার হবে ? ( What will be the benefit of donating blood? in Bangla )
  • রক্তদানের নিয়মাবলী ( Blood donation rules in Bangla)
  • রক্তদান করলে কি রক্তদাতা অসুস্থ হয়ে পড়ে? ( Does donating blood make the donor sick? in Bangla )
  • ট্যাটু করলে কি রক্তদান করা যায়না ? ( Can’t you donate blood if you get a tattoo? in Bangla )
  • রক্তদান কে মহৎকাজ বলা হয় কেন ? ( Why is blood donation called a great deed? in Bangla )
  • রক্তদানেরপর কি রক্তদাতা অসুস্থ হয়ে পড়ে ? ( Does the blood donor get sick after donating blood? in Bangla )
  • রক্তদানের প্রেরণা

রক্তদান এর ইতিহাস :

‘নিরাপদ রক্ত জীবন বাঁচায়’-এই থিম নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর জুন মাসে বিশ্ব রক্তদান দিবস পালন করা হয়।এবারের (২০২০) স্লোগানছিল “Give blood and make the world a healthier place” 

 স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে রক্তদানকারী আড়ালে অজানা বীরের উদ্দেশে, উৎসর্গীকৃত ১৪ই জুন World Blood Donation Day পালন করে আসছে ১৯৯৫ সাল থেকে। নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টিনারের ১৪ই জুন জন্মদিনকে পালন করে ,যিনি রক্তের গ্রুপ বা ABO গ্ৰুপ (A , B ,AB এবং O ) আবিষ্কারকরেছিলেন।

রক্তদানের প্রয়োজনীতা কী ?

রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা কি ? রক্তদান প্রয়োজন এইজন্যে যে, মানবদেহের বাইরে রক্ত তৈরি করা যায়না।মানুষের রক্তের চাহিদাপূরণ করতে পারে একমাত্র মানুষই। মানবদেহ রক্ত ,প্লাজমা এবং অস্থিমিজ্জা দান করে অন্য একটি মানুষের জীবন বাঁচতে পারে। আর 

একমাত্র মানবদেহেই এগুলো তৈরী হয়। মানবদেহের অস্থিমজ্জায় রক্ত তৈরী হয়।তারপর সেটা সারাশরীরে ছড়িয়ে পড়ে।মানব দেহের প্রধান চালিকা শক্তি হল রক্ত।রক্ত কোষের ভেতর অক্সিজেন ও পুষ্টিউপাদান সরবরাহ করে বর্জ্যপদার্থ ও কার্বনডাইঅক্সাইড শরীর থেকে বের করে দেয়।এছাড়াও হরমোন ও এনজাইম বহন করা ,দেহেরতাপ ও জলের সমতা বজায় রাখা , রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা , প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অংশ গ্রহণ ইত্যাদি সমস্ত যাবতীয় শারীর বৃত্তীয় কার্যকলাপ রক্ত করে থাকে।

রক্তমূলত প্লাজমা বা  রক্তরস এবং তিন প্রকার রক্তকণিকায় ( লোহিতরক্তকণিকা , শ্বেতরক্তকণিকাএবংঅনুচক্রিকা) তৈরী হয়।এবং তিন প্রকার রক্ত কণিকা পরিমাণমত মানবদেহে সৃষ্টিলয়ের মধ্যে শারীর বৃত্তীয় যাবতীয় কার্যকলাপ করে থাকে।কোনো কারণবশত এই রক্তকণিকার পরিমাণের তারতম্য ঘটলে বা রক্তকণিকা পরিমাণমত তৈরী নাহলে  মানবদেহে  রক্তের প্রয়োজন হয় , সেই চাহিদা যদি মানবদেহ পূরণ করতে নাপারে তখন তাকে বাইরেথেকে রক্তশরীরে প্রবেশ করতে হয়।সেই সম্ভাব্য কারণগুলো এবং রক্তেরগ্রুপ সম্মন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করে জেনে নেওয়া যাক রক্তদান কেন প্রয়োজন।

  প্রথমত : কোনো দুর্ঘটনা জনিত কারণে মানুষের দেহ থেকে প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণ হলে দুর্ঘটনা গ্রস্ত ব্যক্তিকে বাইরের থেকে রক্ত দিতে হয়।তা নাহলে ব্যাক্তিটির তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটবে।

  দ্বিতীয়ত : কিডনির ডায়ালিসিস-এর মত গুরুত্বপূর্ণ কোনো জটিল রোগের অপারেশন-এর ক্ষেত্রে শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হয় তখন তার রক্তের চাহিদা জন্মায়।

  তৃতীয়ত : থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সারা-জীবনভর বেঁচে থাকতে হয় অন্যের রক্তের উপর নির্ভর করে। তাদের নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন।থ্যালাসেমিয়ার কারণে শরীরে রক্তের ঘাটতি হয়।প্রতিমাসে এই রুগীদের ১-২ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন পড়ে।সেই চাহিদা পূরণ করতে ব্লাডব্যাংক এর উপর ভরসা করতে হয়।

 চতুর্থত : হিমোফিলিয়ায়  আক্রান্ত রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হয়।দেহে অনুচক্রিকার অভাবে কোনো কারণে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত রক্তক্ষরণ হলে রক্তজমাট বাঁধেনা।ফলে এইরোগে আক্রান্ত হলে অন্যের রক্তের উপর নির্ভর করতে হয়।কেমোথেরাপি চিকিৎসার সময় প্রচুর রক্তের চাহিদাহয় , সেই চাহিদা পূরণ করতে বাইরে থেকে রক্তশরীরে প্রবেশ করাতে হয়।

  পঞ্চমত: অঙ্গপ্রতিস্থাপনের মতো জটিল অপারেশনে রক্তের প্রয়োজন পড়ে।

  ষষ্ঠত : রক্তবমি  রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির (১-২ব্যাগ) , ব্লাডক্যান্সার , প্রসকালীন ,হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাইরে থেকে শরীরে রক্ত দিতে হয়।

 সপ্তমত : আগুনে দগ্ধ হলে অথবা অ্যাসিডে আক্রান্ত হলে প্লাজমা বা রক্তরসের প্রয়োজন।

রক্তদানের প্রয়োজনীতা কী ?
রক্তদান এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া।একমাত্র মানুষই পারে মানুষের এই প্রয়োজন মেটাতে।

রক্তদান এর নিয়মাবলী :

যিনি রক্তদানের মত মহৎ কাজ করে মানুষের সেবা করতে চান ,তাকে কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে এবং কয়েকটি শর্তাবলী মেনে চলতে হবে।সেগুলি কি কি চলুন দেখে নেওয়া যাক :

  1. রক্তে  হিমোগ্লোবিনের মাত্রা 11g/dl , বা তার বেশি হতে হবে।
  2. রক্তদাতার বয়স  মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে ১৮-৬৫  মধ্যে হতে হবে।
  3. যিনি রক্তদান করবেন তার  দেহের ওজন কমপক্ষে ৫০কেজি  বা তার বেশি হতে হবে।
  4. রক্তদানের আগে উপোস থাকা চলবে না।
  5. রক্তদানের আগে প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার খাওয়া চলবে না।
  6. মদ্যপান এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে।
  7. রক্তদানের একসপ্তাহ আগে থেকে আয়রন সম্মৃদ্ধ খাবার খেতে পারলে খুব ভালো হয়।
  8. এসময়  শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হবে
  9. রক্তদানের আগে চিকিৎসার সম্পূর্ণ  ইতিহাস জানতে হবে।
  10. একসপ্তাহের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ খেলে কিম্বা একমাসের মধ্যে যেকোনো রোগপ্রতিরোধকারী টিকা নিয়েছে এমনব্যক্তি রক্তদিতে পারবে না।
  11. রক্তদাতার শরীরে হৃৎরোগ , ক্যান্সার ,কিডনির সমস্যা , উচ্চ-রক্তচাপ প্রভৃতি এবং কোনো ছোঁয়াচে রোগ  থাকলে রক্তদান করা যাবেনা।
  12. একবার রক্তদানেরপর প্রায় চারমাস রক্তদান থেকে বিরত থাকতে হবে।কারণ নতুন করে রক্তেরকোষ উৎপন্ন হতে (লোহিত কণিকা আয়ুষ্কাল গড়ে১০০-১২০দিন) প্রায় তিন থেকে চার মাস সময় নেয়।তাই শরীরে যতক্ষণনা সম্পূর্ণ রক্তেরকোষ পুরোপুরি তৈরি হচ্ছে , ততক্ষণরক্তদান করা যাবেনা।
  13. রক্তদানের আগে  রক্তদাতার হেপাটাইটিস ,HIV ,  ডায়াবেটিস বা অন্যকোনো জটিলরোগ আছে কিনা রক্তপরীক্ষা করে যাচাই করে নিতে হবে , যদি থাকে তাহলে কোনো ভাবেই অন্যকোনো ব্যক্তিকে রক্তদান করা চলবেনা।
A-( A+) , (A- ), (AB+) ,(AB-)(A- ) , (O-)
B+(B+)  ,  (AB+)(B+) ,(B-) , ( O+) ,( O-)
B-(B+)  ,(B-) ,( AB+), ( AB-)(B- ),  (O-)
AB+(AB+)সবগ্রুপেরথেকে
AB-(AB+)  , (AB-)(AB-) ,( A- ), (B-)  ,(O-)
O+(O+) ,( A+) ,(B+) ,(AB+)(O+)   ,(O-)
O-সবাইকে(O-)
রক্তদানেরনিয়মাবলী

রক্তদানকে মহৎকাজ বলা হয় কেন ?

রক্তদানকে একটি মহৎ কাজ বলা হয়ে থাকে।পবিত্র ” কোরান ” এ বর্ণিত আছে  ” একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সমগ্র মানবজাতির জীবন বাঁচানোর মতো মহান কাজ। “আপনার রক্তের দ্বারা যে মানুষটি নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে ,সে চিরকাল আপনার কাছে ঋণী হয়ে থাকবে।আপনজন বা প্রিয়জন বা পরিবারের মানুষজন হারানোর কষ্ট ,যে যারা বা যিনি হারিয়েছেন তারাই একমত্র জানেন। আপনার দেওয়া রক্তে যদি কেউ প্রাণ ফিরে পায় তার থেকে আনন্দের ,মানসিক প্রশান্তির আরকিছু হতে পারেনা।সে হাসিমুখে সুস্থ হয়ে তার পরিবারের সাথে আপনার দেওয়া , বাকিজীবনটা কাটাতে পারবে।হয়তো আপনারই অজান্তে আপনারই কোনো প্রিয়জন আপনার রক্তের দ্বারা সুস্থ হয়ে বেঁচে উঠবে।পৃথিবীতে একটা প্রাণবাঁচানো মানে থেমে যাওয়া সৃষ্টিকে নতুন করে চালনা করা।নিঃস্বার্থ , স্বেচ্ছায় রক্তদানকরুন।জীবনবাঁচান।

রক্তদান করলে রক্তদাতার কি উপকার হবে ? 

 রক্তদানের প্রধান এবং প্রাথমিক উপকারিতা অন্য আর একটি মানুষের জীবন বাঁচানো।

এছাড়াও  রক্তদান রক্তদাতার  স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী। অন্তত চারমাসের ব্যবধানে নিয়মিত রক্তদান করলে রক্তদাতার  যেসব শারীরিক উপকার হবে সেগুলি হল :

(১) হৃৎপিণ্ড, লিভার, অন্ত:স্রাবগ্রন্থি এবং সারা শরীরজুড়ে  বিভিন্ন অঙ্গে জমে থাকা রক্তে আয়রনের মাত্রা বৃদ্ধিপেলে হৃদরোগের ও লিভারের অসুস্থতার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে , এটি বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত।নিয়মিত রক্তদান করলে রক্তে অতিরিক্ত  আয়রনের মাত্রা হ্রাসপায়।তাই নিয়মিত রক্তদান করা উচিত এতে হৃদযন্ত্র ও লিভার সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি কমবে।

(২) বর্তমান যুগে মরণ ঘাতী রোগ ক্যান্সারের প্রকোপ অত্যন্ত বেশি।নিয়মিত রক্তদানে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেকটায় কমে যায়।

(৩)  রক্তদান করলে রক্তদানের পর রক্তকণিকা জন্ম নেওয়ায় নতুন উদ্দীপনা ফিরেপায় ,যেটি শরীরের পক্ষে অধিক কার্যকারী।

(৪) রক্তদানেরক্ষেত্রে রক্তদাতার রক্তে হেপাটাইটিস ,ডায়াবেটিস , HIV , থাইরয়েড ও অন্যান্যরোগ আছেকিনা তা সর্বপ্রথমে পরীক্ষা করে যাচাই করা হয়।এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় রক্তদান করলে এই টেস্ট গুলি নিজ খরচায় করে আগে থেকে রোগ সম্মন্ধে সচেতন হতে পারবে।

(৫)নিয়মিত রক্তদানে রক্তের অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, লিপিড এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা হ্রাসপায়।নিয়মিত রক্তদানে রক্তকণিকায় জমে থাকা অতিরিক্ত আয়রন , যা রক্তনালীর স্বাভাবিক কাজে বাধা প্রাপ্তহওয়ার সম্ভাবনা করে,সেটা সঠিক মাত্রায় বজায় থাকে।

(৬)এছাড়াও নিয়মিত রক্তদানে বয়স বেড়েযাওয়া প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

ট্যাটু করলে কি রক্তদান করা যায়না ?

 বিভিন্ন আদি বাসীদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিশেষ অঙ্গ  ট্যাটু বা উল্কি।অনুপ কুমার দত্তের  “Tattoos- a tribal heritage” বইএ বিভিন্ন আদিবাসী জাতির মধ্যে ট্যাটুর ব্যবহার ও প্রচলন সম্মন্ধে বিস্তারিত আলোচনা আছে।

আজকাল নতুন প্রজন্ম ফ্যাশন শরীরের বিশেষ অংশকে আকর্ষণীয় করে তুলতে  নিজের পছন্দ ,রুচি অনুযায়ী , স্টাইল অনুযায়ী মহিলা পুরুষদেহে ট্যাটু বানিয়ে থাকে।

রক্তদানের অন্যতম একটিপ্রধান একটি শর্ত শরীরের কোনো অংশে ট্যাটু  থাকলে অন্য কোনো ব্যক্তিকে রক্তদান করতে পারবে না।এটি সম্পূর্ণ সত্যি নয়।ট্যাটু বানানোর সরঞ্জাম কালি , সূচ , লেজাররশ্মি ,ধাতববস্তু  প্রভৃতি যেকোনো বহিরাগত বস্তু শরীরে প্রবেশ করলে এগুলো শরীরের রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে এবং তারসাথে শরীরে ক্ষতিকারক ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।শরীরে ট্যাটু থাকলে কয়েকটি দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে ,এবং কতগুলি শর্ত মেনে চলতে হবে। 

  • ট্যাটু আঁকার সুচে হেপাটাইটিস B , হেপাটাইটিস C , HIV ইত্যাদি সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে তাই সরকারী ভাবে বা নিয়মনীতি মেনে পেশাগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে সবসময় ট্যাটু বানানো উচিত।
  • শরীরের কোনো অংশে  ট্যাটু বানালে একবছর রক্ত দান থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • রেডক্রিসেন্ট সংস্থার মতানুযায়ী নিরাপদ কালি ও সূচ ইনফ্রারেড রশ্মি দিয়ে বিশুদ্ধ করে ট্যাটু বানালে রক্তদান করা যেতে পারে।
  • ট্যাটু বানানোর আগে অবশ্যই দেখে নিতে হবে , ট্যাটুর সূচ অটোক্লেভযন্ত্রে নির্বীজকরণ করা হচ্ছে কিনা এবং ট্যাটুর কালি নতুন ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা।এতেকরেরক্তদানএসংক্তমনেরআশঙ্কাঅনেকাংশেকমেযায়। 
  • তবে রক্তদানের আগে অবশ্যই নিজের একবার রক্তপরীক্ষা করে নিতে হবে।

পিরিয়ড চলা কালীন মহিলাদের রক্তদান করা উচিত কিনা ?

 স্বেচ্ছায়  রক্তদান নিঃসন্দেহে একটি মহৎকাজ। এতে রক্তদাতার মানসিক তৃপ্তি জড়িয়ে থাকে। একজন মহিলা ঋতুবতী হলে কি রক্তদান করতে পারবে ? সেক্ষেত্রে মহিলাদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।মেন্সট্রুয়েশন বা মাসিক চলাকালীন পেটে অস্বস্তি বা অসহ্যযন্ত্রণা  বা শারীরিক কোনো অসুবিধা মাথা ঘোরা, বমিবমিভাব ,খাবারে অরুচি  থাকলে রক্তদান থেকে বিরত থাকায় সমীচীন। 

এছাড়াও অতিরিক্ত ব্লিডিং এ মহিলারা অনেক সময় রক্তাল্পতায় ভোগে তাই সে সময় রক্তদান না করায় ভালো।

অন্য কোনো সমস্যা নাথাকলেও অতিরিক্ত ব্লিডিংহলে ও রক্তদান থেকে বিরত থাকতে হবে।

 মাসিক চলাকালীন  হিমোগ্লোবিনেরমাত্রা 11 g/dl নীচেথাকলে রক্তদান করা চলবেনা।

 পিরিয়ড চলাকালীন মহিলাদের শারীরিক ,মানসিক নানান সমস্যার মধ্যদিয়ে যেতে হয়।মহিলাদের উপরোক্ত সমস্যাগুলি নাথাকলে রক্তদান করাযেতেপারে।

গোল্ডেন ব্লাড বা বিরল তম রক্ত কি ?

মানব দেহে সাধারণ অতি পরিচিত চারপ্রকার রক্তের মধ্যে এমন একটি রক্ত আছে যাকে বিশ্বের ‘বিরলতম’ রক্তের গ্রুপ বা গোল্ডেন ব্লাড বলা হয়।

মানুষ বললাম এইকারণে অন্যান্য গৃহপালিত পশুর রক্তেরগ্রুপ আলাদাহয়।

 (O-) নেগেটিভ হল তেমনই একটি বিশ্বের ‘বিরলতম’ রক্তেরগ্রুপ ,চিকিৎসাবিজ্ঞানে  এটি‘ আরএইচ-নাল’ (Rh-Null) বা‘ গোল্ডেনব্লাড ’নামে পরিচিত।১৯৬১সালে প্রথম এরসন্ধান পাওয়া যায়।প্রতি৬০,০০,০০০মধ্যে মাত্র১জনের শরীরে এইরক্তের সন্ধান মেলে।

O- গ্রুপের রক্তধারণকারী ব্যক্তি শুধুমাত্র (O )ব্লাডগ্রুপের থেকে রক্তনিতে পারে , কিন্তু সবঅন্য গ্রুপকে রক্তদিতে পারবে।তাইযেসব ব্যক্তিরদেহে (Rh-Null) রক্ত আছে চিকিৎসকদের মতে তাদের খুবসাবধানে জীবন-যাপন করতে হয়।কারণ বিগত ৫৮ বছরে বিশ্বে মাত্র ৪৩জন মানুষের মধ্যে এই (O-) গ্রুপের অস্তিত্বের খোঁজ মিলেছে।তাই এক একটি জীবন মূল্যবান তাদের বিরলতম রক্তের জন্য। একটি মানুষ প্রায় ৩৫০ মিলিলিটার (একব্যাগ) রক্ত দান করতে পারে ,যা থেকে চারজন মানুষকে বাঁচানো সম্ভব। যেহেতু চাহিদার তুলনায় খুবই কম পরিমাণে পাওয়া যায় তাই যতটা সম্ভব সুস্থভাবে সাবধানে জীবন যাপন করা উচিত।

রক্তদান কোথায় করবেন ?

প্রতিবছর  বিভিন্ন  সংস্থার দ্বারা রক্তদানের মাধম্যে বিশ্বে ৮কোটি ইউনিট সংগ্রহ করা হয়। যার৩৮% রক্ত সংগৃহিত হয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে। 

বাংলাদেশের অন্যতম  স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান কেন্দ্র  ‘ সন্ধানী ‘ একবিখ্যাত সংস্থা।যেটি ২০০৪সালে বাংলাদেশসরকার দ্বারা দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিতহয়।

এছাড়াও  সমগ্র ভারত বর্ষজুড়ে রোটারি ব্লাডব্যাংক , ভারতীয় রেডক্রস সোসাইটি ,জীবন বাঁচান ভারত , লায়ন্স  ব্লাডব্যাংক   প্রভৃতি রক্তদান সংস্থা আছে।এছাড়াও সারাবিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন রক্তদানের সংস্থা ,ব্লাডব্যাংক আছে।

নিজস্ব অঞ্চল ,শহরে কোনো বিশেষ দিনপালন করার জন্য বা অন্যযেকোনোউদ্দেশ্যক্লাব , স্বেচ্ছাসেবীসংস্থা , রাজনৈতিক দল বা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠান রক্তদান শিবির করে থাকে।সেখানে নিঃস্বার্থ সুস্থস্বাভাবিক (১৮-৬৫) নিয়মওশর্তাবলীমেনে   রক্তদানকরুন।

রক্তদানেরপর কি রক্তদাতা অসুস্থ হয়ে পড়ে ?

  রক্তদান রক্তদাতার শরীরের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী।সাধারণত একজন স্বাভাবিক পূর্ণবয়স্ক মানুষের দেহে ৫-৬ লিটার রক্তথাকে । সর্বোচ্চ যেকোনো ব্যক্তি চারমাসের ব্যবধানে একবারে একব্যাগ রক্তদিতে পারে, যা থেকে তিনজন মানুষের রক্তের অভাব পূরণ করা সম্ভব ।

রক্তদানেরপর পরিমাণমত পরিশুদ্ধ জল খেতে হবে। এমন কোনো মানে নেই রক্তদাতা কে ভালো-ভালো খাবারই খেতে হবে।

রক্তদানেরপর রক্তদাতার অনেক সময় সাময়িক মাথা ঘোরা ,দুর্বলতা ,কালচে-ছোপ,মাংসপেশীতে খিচুনি দেখা দিতে পারে। সেসব সহজেই ঠিক হয়ে যায় , কোনো ওষুধের প্রয়োজন পড়েনা।

রক্তদানেরপর একঘন্টা সম্পূর্ণ বিশ্রাম করলেই রক্তদাতা স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারবে। তাই নির্ভয়ে রক্তদান করুন।

রক্তদানের প্রেরণা :

এমনও বহু মহৎ মানুষ আছেন যারা তাদের সারাজীবন অন্য মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে নিজের জীবন উৎসর্গীকৃত করেন।

অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক মি.হ্যারিসন এমন একব্যক্তি যিনি স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে নিজের রক্ত ও প্লাজমা দান করে একাই ২০লাখ শিশুর প্রাণ  বাঁচিয়ে গিনেসওয়ার্ল্ড রেকর্ড করেছেন।

তিনি রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন খুব অল্প বয়সেই।

 কোনো কারণে মাত্র ১৪বছর বয়সে  জরুরি অস্ত্রোপচারের কারণে ১৩লিটার রক্তের প্রয়োজন হয়েছিলতাঁর।সেযাত্রায় বেঁচেযাওয়ায় ১৮বছর থেকে তিনি নিয়মিত রক্তদান করতে শুরু করেন। 

এছাড়াও সবার অতিপরিচিত ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ,তিনিও নিয়মিত বছরে দুবার রক্তদান করেন। এবং অস্থি মজ্জা দান করে বহু-মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।তিনিনিয়মিতরক্তদানশিবিরকরেন। 

ট্যাটু করলে কি রক্তদান করা যায়না ?
রোনালদো শুধুমাত্র রক্তদান করে মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে , প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যে ট্যাটু করেননি আজও।

এমনকি প্রায় ক্রীড়াবিদরা সারা-শরীরজুড়ে তাদের পছন্দ মতো ট্যাটু করিয়েছেন। কিন্তু রোনালদো শুধুমাত্র রক্তদান করে মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে ,প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যে ট্যাটু করেননি আজও।

 তিনি তার যৌবনকাল থেকে নিয়মিত রক্তদান করে থাকেন ,তিনি রক্তদানের প্রেরণা কোথায় পেয়েছিলেন সেটা ব্যাখ্যা করেছেন  –

“Ronaldo, who is also a bone marrow donor, decided to first donate blood when the son of his Portuguese teammate, Carlos Martins, fell ill with leukemia.”

“I did it many years ago and if I had to do it again, I would, because this is a very serious disease for many children and we need to help them…It’s a simple process and then you feel happy because you know you are helping another person,” he once said.

 রোনালদো,নিঃসন্দেহে মানুষদের কাছে একটা প্রেরণা।যাকে দেখে বহুমানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদানে আগ্রহী হবে।

সবধর্মের – বর্ণের – জাতের রক্তের রঙ এক লাল (Red)।তাই ভেদাভেদ , হিংসা ভুলে  মানবতার খাতিরে রক্তদান করুন।অন্যের জীবন বাঁচান।অসংখ্য অজানা নিয়ন্ত্রণ শক্তির কাছে অসহায় জীবন আপনার রক্তের অপেক্ষায়।অলৌকিক শক্তি না থাকা সত্ত্বেও আপনিই পারেন একসাথে তিনটি  মানুষের প্রাণ বাঁচতে আপনার রক্তের দ্বারা।তাই বিনামূল্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান করে পৃথিবীর মানব জাতির একটি প্রাণকে বাঁচিয়ে তুলুন।

তথ্যসূত্র:

সংবাদপ্রতিদিন ,কোরা, বিজনেস ইন সাইডডার ও অন্যান্য নিউজ সাইট ।

2 thoughts on “রক্তদান কেনো করবেন ?

Leave a Reply