নিম্ন রক্তচাপ

নিম্ন রক্তচাপ: কারন, লক্ষণ ও চিকিৎসা

নিম্ন রক্তচাপকে প্রচলিত ভাষায় হাইপো-টেনশন বা লো-প্রেশার বলা হয়। অনেকের কাছেই এটি খুব পরিচিত ব্যাপার। সচরাচর গুরুতর কোনও সমস্যা তৈরি না করায় অনেকে নিম্ন রক্তচাপকে তেমন গুরুত্ব দেয়না। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে নিম্ন রক্তচাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই এবং এর জন্য বিশেষ কোনও চিকিৎসারও প্রয়োজন হয়না। তবে অস্বাভাবিক নিম্ন রক্তচাপের কারণে মাথা ঘোরা থেকে শুরু করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

নিম্ন রক্তচাপ বা হাইপো-টেনশন কি?

রক্তচাপ মাপার যন্ত্রে দুটি সংখ্যা দেখা যায়। এদের মধ্যে উর্দ্ধমান সংখ্যাটি সিস্টোলিক এবং নিম্নমান সংখ্যাটি ডায়াস্টোলিক নামে পরিচিত। সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিকের মানের উপর ভিত্তি করে নিম্ন রক্তচাপ নির্ধারণ করা হয়। সিস্টোলিক মান ৯০ মিমি(Hg) এবং ডায়াস্টোলিক মান ৬০মিমি(Hg) এর কম হলে তখন তাকে লো-প্রেশার বা নিম্ন রক্তচাপ হিসেবে ধরা হয়।

নিম্ন রক্তচাপের লক্ষণ


উল্লেখযোগ্য কোনো লক্ষণ ছাড়াই প্রত্যেকের কোনো না কোনো সময় রক্তচাপ কমে যায়। তবে নিম্ন রক্তচাপের এমন কিছু লক্ষণ রয়েছে যেগুলা রোগীর জন্য বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো হলোঃ

  • মাথা ঘোরা
  • মাথা ভীষণ হালকা অনুভূত হওয়া
  • বমি বমি ভাব
  • ক্লান্তি
  • দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা
  • কোনো কাজে মনোযোগ দিতে না পারা
  • দ্রুত এবং অগভীর শ্বাস
  • শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া
  • অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

নিম্ন রক্তচাপের কারণ সমূহ

বিভিন্ন কারণে আপনার রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এর মধ্যে খুব সাধারণ কিছু কারণ হলোঃ

  • দীর্ঘ সময় বিছানায় শুয়ে থাকা।
  • রক্ত স্বল্পতাঃ দুর্ঘটনা, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা অন্য যেকোনো কারণে শরীরে রক্তের পরিমাণ কমে গেলে রক্তের চাপও কমে যায়।
  • গর্ভাবস্থাঃ গর্ভাবস্থায় মা এবং বিকাশিত ভ্রূণের রক্তের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে নিম্ন রক্তচাপ দেখা দেয়। প্রেগন্যান্সির প্রথম ২৪ সপ্তাহের মধ্যে রক্তচাপ কমে যাওয়া খুব সাধারণ ব্যাপার।
  • হার্টের সমস্যাঃ হার্টের ভালভের সমস্যা, হার্ট অ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলিওর জাতীয় সমস্যা থাকলে হার্ট থেকে স্বাভাবিক গতিতে রক্ত সরবরাহ হয়না। ফলে রক্তচাপ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • পুষ্টির অভাবঃ প্রয়োজনীয় ভিটামিন B12 এবং ফলিক অ্যাসিডের অভাবে রক্ত স্বল্পতা হয়, যার ফলস্বরূপ নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে।
  • ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াঃ বিশেষ কিছু ওষুধ সেবনের কারণে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের মাত্রাতিরিক্ত সেবন, হার্টের ওষুধ , পারকিনসন রোগের ওষুধ, অ্যালকোহল উল্লেখযোগ্য।
  • থাইরয়েড, লো ব্লাড সুগার, ডায়াবেটিস জাতীয় সমস্যার কারণে হরমোন উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলির জটিলতা থেকেও হাইপো-টেনশন হতে পারে।

নিম্ন রক্তচাপের চিকিৎসা

  • গরম আবহাওয়ায় প্রচুর পরিমাণে পানি ও ফলের জুস পান করতে হবে।
  • সর্দি বা কাশির মতো ভাইরাল অসুখ হলে বেশি বেশি তরল পান করা।
  • অ্যালকোহল যুক্ত পানীয় বা মদ পান করা কমাতে হবে। সম্ভব হলে চিরতরে বর্জন করে খাদ্য তালিকায় লবণের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
  • ভারী জিনিস না তোলা।
  • গরম পানি দিয়ে গোসল না করা।
  • শুয়ে থাকা অবস্থা থেকে ওঠার সময় সরাসরি না দাঁড়িয়ে বিছানার কিনারে কয়েক মিনিট পা ছড়িয়ে বসে থাকা।
  • দীর্ঘ সময় এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে সামান্য হাহাহাটি করা।
  • শরীরে রক্ত প্রবাহ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করা।

নিম্ন রক্তচাপের ধরণ

লক্ষণের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা নিম্ন রক্তচাপ বা হাইপো-টেনশনকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেন। নিম্ন রক্তচাপের কিছু ধরণের মধ্যে রয়েছেঃ

লো ব্লাড প্রেশার অন স্ট্যান্ডিং আপ (অরথোস্ট্যাটিক বা পোস্টারাল) :

আপনি যখন বসার অবস্থান বা শুয়া থেকে উঠে দাঁড়ান তখন রক্তচাপ হঠাৎ হ্রাস পায়।

আপনি দাঁড়ালে মাধ্যাকর্ষণ আপনার পায়ে রক্ত ​​সঞ্চারিত করে। তখন সাধারণত , আপনার দেহ একে স্বাভাবিক করতে আপনার হার্ট রেট বাড়িয়ে দেয় এবং রক্তনালীগুলি সঙ্কীর্ণ করে ফেলে, যার ফলে আপনার মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত ​​ফিরে আসে।

কিন্তু অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশনের লোকেরা, এই ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়াটিতে ব্যর্থ হয় এবং রক্তচাপ হ্রাস পায়, মাথা ঘোরে, হালকা অনুভব করে, ঝাপসা দৃষ্টি এমনকি মূর্ছা দেখা দেয়।

ডিহাইড্রেশন, অতিরিক্ত ঘুম, গর্ভাবস্থা, ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, পোড়া, অতিরিক্ত উত্তাপ এবং কিছু স্নায়বিক রোগ সহ বিভিন্ন কারণে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন দেখা দিতে পারে।

বেশ কয়েকটি ওষুধও অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশনের কারণ হতে পারে, বিশেষত উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ওষুধগুলি – ডায়ুরিটিকস, বিটা ব্লকার্স, ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার্স এবং অ্যাঞ্জিওটেনসিন-রূপান্তর কারী এনজাইম (এসিই) ইনহিবিটর – পাশাপাশি অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টস এবং পার্কিনসন রোগের চিকিৎসায় এবং ইরেক্টিলের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ঔষধ।

অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়, তবে এটি অল্প বয়স্কদেরও প্রভাবিত করে।

লো ব্লাড প্রেশার আফটার ইটিং (পোস্টেরেন্ডাল হাইপোটেনশন):

রক্তচাপের এই নিম্নমুখীতা খাওয়ার এক থেকে দুই ঘণ্টা পরে লক্ষ্য করা যায় এবং বেশিরভাগ সময় বয়স্ক ব্যক্তিদের এ সমস্যা দেখা যায়।

আপনি খাওয়ার পরে রক্ত ​​আপনার হজমের কাজে প্রবাহিত হয়। সাধারণত, আপনার শরীর হার্ট রেট বাড়িয়ে এবং নির্দিষ্ট রক্তনালীগুলিকে সীমাবদ্ধ করে আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে কিছু লোকের মধ্যে এই প্রক্রিয়াগুলি ব্যর্থ হয় যার ফলে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া লক্ষ্য করা যায়।

পোস্টপ্রেন্ডিয়াল হাইপোটেনশনের কারণে উচ্চ রক্তচাপ বা সয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের ব্যাধি যেমন পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এ ধনের লো প্রেসারে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

কম খাবার খাওয়া, কম-কার্বোহাইড্রেট খাবার; বেশি পানি পান করা; এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা উপসর্গগুলি হ্রাস করতে সহায়তা করে।

ত্রুটিযুক্ত মস্তিষ্কের সংকেত থেকে নিম্ন রক্তচাপ (নিউরেলি মিডিয়াটেড হাইপোটেনশন):

দীর্ঘসময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে হটাৎ রক্তচাপের পার্থক্য দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি প্রাপ্তবয়স্কদের এবং শিশুদেরকে প্রভাবিত করে। এটি হার্ট এবং মস্তিষ্কের মধ্যে ভুল তথ্য আদান প্রদানের কারণে ঘটে থাকে।

স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির কারণে নিম্ন রক্তচাপ ( মাল্টিপল সিস্টেম অ্যাট্রোফি উইথ অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন):

এটি শাই-ড্রাগার সিনড্রোম নামেও পরিচিত, এই বিরল ব্যাধিটিতে অনেকগুলি পার্কিনসন রোগ-জাতীয় লক্ষণ রয়েছে। এটি সয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্বক ক্ষতির কারণ, যা রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, শ্বাস এবং হজমের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি নিয়ন্ত্রণ করে। শুয়ে থাকার সময় এটি খুব উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টির কারন হতে পারে।

জটিলতাঃ

নিম্ন রক্তচাপের কারনে মাঝারি আকারে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অজ্ঞান হওয়া এমনকি ফলস্বরূপ আঘাতও পেতে পারেন।

এবং মারাত্মকভাবে নিম্ন রক্তচাপ আপনার দেহের কার্য সম্পাদনে বাধা প্রদান করতে পারে। অক্সিজেন ঘাটতি থেকে আপনার হার্ট এবং মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে।