ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ

ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ

ডেঙ্গু জ্বর এ মৃত্যুর ঝুঁকি কতটা ?

 ডেঙ্গু জ্বর সাধারণ একটি মশা বাহিত ভাইরাল ফিভার। একটু সচেতনতা ও আসে-পাশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেটাই কম।সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চললে ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যুর তেমন কোনো ঝুঁকি নেই, সহজেই সুস্থ হওয়া যায়।  

সব ডেঙ্গু জ্বর হাই-ফিভার হয়না এবং সব ডেঙ্গুরোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হবার প্রয়োজন হয় না, ৮০% ডেঙ্গি আক্রান্ত রোগীর বাড়িতেই ডাক্তারের পরামর্শ মত চিকিৎসা অনুযায়ী ভালো হয়ে যায়।

এইনিবন্ধে ডেঙ্গু সম্পর্কে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে ডেঙ্গুর মোকাবিলা কিভাবে করবো সেগুলো আলোচনা করা হয়েছে।প্রথমে ডেঙ্গু কি তার সম্মন্ধে ধারণা দেবো তারপর ডেঙ্গুর যথার্থ গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করব।এইনিবন্ধের আলোচ্য বিষয় গুলি হল :

  • ডেঙ্গু বা ডেঙ্গি কি? ( What is Dengue ?)
  • ডেঙ্গু মশা চিনবো কি করে ? ( How can we recognize Dengue mosquitoes? )
  • ডেঙ্গু জ্বর কত ধরনের হয় ? ( How many types of dengue fever are there? )
  • ডেঙ্গু জ্বর কোন সময় হয় ? ( When does Dengue fever occur? )
  • ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ কোথায় বেশি? ( Where is the incidence of Dengue fever high? )
  • ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে কি করণীয়? ( What to do to avoid dengue? )
  • ডেঙ্গু ভ্যাকসিন ( Dengue Vaccine )
  • প্লেটলেট আসলে কি? ( What exactly is platelet? )
  • কি করে বুঝবেন ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে ? ( How do you know that Dengue fever has occurred? )
  • ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেই কি মৃত্যু ? ( Is death due to Dengue?)
  • একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে কি ভবিষ্যতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আছে ? ( Is dengue likely to occur in the future once you are diagnosed with dengue?)
  • এই সকল প্রশ্নের উত্তর আমরা নিবন্ধে পাবেন।

ডেঙ্গু জ্বর বা ডেঙ্গি কি ?

ডেঙ্গু হল একটি মশা বাহিত রোগ। ডেঙ্গু বা ডেঙ্গি ভাইরাস (Dengue Virus) জনিত জ্বর।  ডেঙ্গু  ফ্ল্যাভিভাইরিডি পরিবার ও ফ্ল্যাভিভাইরাস গণের অন্তর্ভুক্ত এডিসইজিপ্ট  মশা বাহিত RNA ভাইরাস।একই সঙ্গে এইমশা ইয়োলোফিভার ,জিকাভাইরাস, চিকনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক।স্ত্রী এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। ভাইরাসের চারটি ভাগ আছে DENV-1, DENV-2, DENV-3, DENV-4 এগুলিকে একসাথে সেরোটাইপ বলে, এগুলি মিলে রোগের একটি পুর্ণচিত্র তৈরি করে।ডেঙ্গু ভাইরাসের এই রকম পাঁচটি সেরোটাইপ আছে।

ডেঙ্গু ভাইরাস মানব শরীরের লালা রসের মাধম্যে প্রবেশ ত্বকে প্রবেশ করে রক্তে শ্বেতকণিকায় ঢুকে শরীরের কোষে আক্রমণ করে।কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাইরাসের  আক্রমণের জেরে রক্তনালীর ছিদ্র বেড়ে ভিতরের জলীয় পদার্থ বাইরে বেরিয়ে এলে অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ডেঙ্গুর মশা চিনবো কি করে ?

ডেঙ্গু জ্বর বাহক এডিস মশাকে টাইগার মশাও বলা হয় , কারণ এর গায়ে সাদাকালো ডোরা কাটা দাগ থাকে।এই জাতীয় মশা মাঝারি আকারের হয়। এর অ্যান্টেনা বা শুড়টি দেখতে কিছুটা লোমশ হয়। পুরুষ মশার অ্যান্টেনা স্ত্রীমশার চেয়ে বেশি লোমশ দেখতে হয়।

এডিস মশা শুধুমাত্র দিনের বেলায় কামড়ায় সূর্যোদয়ের দু থেকে তিন ঘণ্টা পর এবং সূর্যাস্তের কয়েক ঘণ্টা আগে।এডিস মশা রাতে কামড়ায় না। অন্যকোনো ভাইরাসে সংক্রমিত থাকা অবস্থায় এডিস মশা যদি কোনো মানুষকে কামড়ায় তাহলে  সুস্থ মানুষটির ডেঙ্গু হতে পারে।তাই এডিস মশা কামড়ালেই যে ডেঙ্গু হবে তার কোনো মানে নেই।

dengue mosquito
dengue mosquito-dr kotha

ডেঙ্গু একটি বহু যুগ পুরোনোএকটিরোগ ৯৯২ খ্রিস্টাব্দে চীনের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্রে প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল।কারো কারো মতে ডেঙ্গু রোগটি তার থেকেও পুরোনো চৈনিকজিন রাজতন্ত্রের আনুমানিক ২৬৫-৪২০খ্রীষ্টপূর্ব সময় কালীন।

‘ডেঙ্গু ‘ নামটি কোথাথেকে এসেছে তানিয়ে বিভিন্ন মতবাদ আছে।নেদারল্যান্ডের গবেষক ডি. এ. ব্লেইজিস-এরমতে, সোয়াহিলি ভাষার ‘ডিঙ্গা‘ শব্দটি এসেছে স্প্যানিশ শব্দ ‘ডেঙ্গু‘ থেকে, যার মানে হলো ‘ সতর্কথাকা ‘ ।এছাড়াও ডেঙ্গু নিয়ে অন্য অনেক মতবাদ আছে।

ডেঙ্গু জ্বর কত প্রকার ও কি কি?

ডেঙ্গু জ্বর প্রধানত তিন ধরনের হয় –

(ক) ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু – এটি খুবই সাধারণ, বেশির ভাগই ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। এই ডেঙ্গু বা  ডেঙ্গি জ্বরে আক্রান্তের শরীরে অসহ্য ব্যথা হয় , ‘যাকে ব্রেকবোন ফিভার’ বা  ‘হাড়ভা-ঙ্গাজ্বর’ বলা হয়। জ্বরের সাথে মাথা ব্যথা ,বমি বমি ভাব, চোখের পিছনে ব্যাথা হয় কারো কারো ক্ষেত্রে।শরীর প্রচণ্ড ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

(খ) হেমোরেজিক ডেঙ্গু – এই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার নার্সের পর্যবেক্ষণের আয়তাও থাকতে হবে। এক্ষেত্রে রক্তের প্লেটলেট বা অনুচক্রিকার সংখ্যা কমতে থাকে খুব দ্রুত ফলে রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায়। তার ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত ক্ষরণ হয়,ত্বকে রেশ বেরোয় তাকে ‘ পেচেটি ‘ বলে।এতে রক্তপাত সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয় – রুগীর দাঁত দিয়ে ,নাক দিয়ে , মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হতে পারে , কালো পায়খানা হয় , মহিলাদের ক্ষেত্রে অ্যাব-নরমাল পিরিয়ড হতে পারে।

(গ) ডেঙ্গু শকসিনড্রোম – এটি সবচেয়ে মারাত্বক ডেঙ্গু রোগ।কখনো রুগীর জ্বর থাকতেওপারে আবার নাওপারে।গায়ে হতে পায়ে ব্যাথা থাকে।কিন্তু রুগীর পালসরেট, প্রেসাররেট থাকেনা রোগীর শকে থাকে ,কিন্তু দেখে বোঝাযায় না।এখানে রোগী হেমোরেজিক এবং শকসিনড্রোম দুটোতেই একসাথে আক্রান্ত হয়।এক্ষেত্রে রোগী দ্রুত চিকিৎসা নাপেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।মানবদেহে জলশূন্যতা তৈরি হয় ,হঠাৎকরে পালসরেট বেড়ে যায় ,রক্তচাপ কমে যায়,  শরীর ঠান্ডা হয়ে যায় , নিঃশ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত ওঠা-নামা করে।

ডেঙ্গু জ্বর কোন সময় হয়?

গরমের সময় ( মে – জুন ) থেকে শুরু করে ,বর্ষায় ব্যাপক আকার ধারণ করে তারপর আস্তে আস্তে এর দাপট কমে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর গতি কিছুটা কমে আসে।বর্ষার মরশুমে এডিস মশার ডিম থেকে ফুটে ওঠা লার্ভা বিনা জলে ২-বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।একমাত্র এডিস মশার নিধন ছাড়া এই মশার বংশ বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয় আর  যতদিন না বংশ বিস্তার সমুলে উৎপাটিত করা যাচ্ছে ডেঙ্গু নির্মূল করা সম্ভব নয়।

কোথায় কোথায় ডেঙ্গু জ্বর এর প্রকোপ দেখা যায়?

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলোর সাথে ইউরোপ, ব্রাজিল, জার্মানি সহ বিভিন্ন দেশে কম বেশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মূলত বাংলাদেশ ও ভারত জুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ অত্যন্ত বেশি।এডিস মশা গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বেশি জন্মায় তায় এই সব নিরক্ষীয় এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। WHO এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৯-এ বিশ্বব্যপী ডেঙ্গুর আক্রান্তের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ।

২০০০-সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ডেঙ্গি থাবা বসায়। সরকারি সূত্রে জানা যায় ৯৩জনের মৃত্যু হয়েছে।২০০৩-এ সেটা কমতে কমতে প্রায় শূন্যে নেমে আসে।তারপর আবার ২০১৮সালে ১০,১৪৮জন আক্রান্ত হয় এবং ২৬জনের মৃত্যু হয়।২০১৯সালের এপ্রিল মাস থেকে আবার ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করে।সেটা অগস্টমাস নাগাদ ঢাকা সহ আসে পাশে  সমস্ত জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯,৫১৩আক্রান্তদের মধ্যে বেশির ভাগই পাঁচ বছরের নিচের শিশু ,১৪জনের মৃত্যু হয়েছে। এমনকি ২৪ঘণ্টায় রেকর্ড সংখ্যক আক্রান্ত হয়েছে ১৭১২জন , প্রতি ঘণ্টায় ৭১জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে।

যতই দিন গেছে আক্রান্তদের সংখ্যা ক্রমশই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে সর্বমোট ১লাখ ১হাজার ৩৪৫জন হয়েছে।সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে ২০২০সালে পার তা কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ডেঙ্গু নিধনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।২০২০ বাংলাদেশের চিকিৎসক ও গবেষক দল মিলে তাদের গবেষণায়অ্যালট্রোমবোপাগ  নামক ওষুধটির উপরে আশার আলো দেখছে সেটি চিকিৎসা সাময়িকী ‘ দি লেনসেট জার্নাল ‘ এর ‘ ইক্লাইন মেডিসিন ‘ এ ২১-নভেম্বর ফলাফল প্রকাশ করেছে । তবে এটি সুস্থতার পাশাপাশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকার জন্য চিকিসায় ছাড়পত্র পায়নি।

ভারতে উত্তর থেকে দক্ষিণ পশ্চিম বঙ্গের বিস্তীর্ণএলাকা জুড়ে বর্ষার মৌসুমে প্রতি বছর বহু মানুষ ডেঙ্গি রোগে আক্রান্ত হয়। কলকাতা , পশ্চিম বঙ্গসহ পার্শ্ববর্তি এলাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে ২০০৭সালে ডেঙ্গি ভয়া বহ আকার ধারণ করেছিল। হাওড়া ,দমদম , ভাঙ্গড় ,কৃষ্ণনগর ,মালদা ,জলপাইগুড়ি সহ বিভিন্ন রাজ্যে ডেঙ্গুর প্রভাবে প্রায় ২০,০০০এর ওবেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ,সাথে মৃত্যু মিছিলও ছিল অব্যাহত।২০১৮সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৩০০০ এবং ২০১৯ এ সেটা ৪৭০০০।

ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন বা  টিকা

ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধের টিকা মাত্র কয়েকটি দেশে অনুমোদিত পেয়েছে।  বাংলাদেশ,ফ্রান্স ,থাইল্যান্ড ,ফরাসি, ইউরোপ , জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়বার ভ্যাকসিন এর উপর কাজ করছে , কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও পেয়েছে।

বিজ্ঞান-জার্নালসায়েন্স ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন  এর সাম্প্রতিক সংখ্যায়দ্যা আলাইভ অ্যাটেন্যুয়েটেড ডেঙ্গি ভ্যাকসিন টিভি-০০৩এলিসিট্‌স কমপ্লিট প্রোটেকশান এগেনস্ট ডেঙ্গি ইন আ হিউম্যান চ্যালেঞ্জ মডেল  শিরোনামে ডেঙ্গি ভাইরাসের নিধন যোগ্য সেরোটাইপ ডেন-১ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কারের  দাবি জানিয়েছেন আমেরিকার ‘ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজে’র (NIEAD) ভাইরোলজি স্টস্টিফেন হোয়াইট হেড ও তাঁর সহযোগী গবেষকেরা  । 

প্লেটলেট  বা অনুচক্রিকা কি ও ডেঙ্গু রোগে এর ভূমিকা কি?

রক্তের প্রধান দুটি অংশ , রক্তরস বা প্লাজমা ও তিনটি রক্ত কণিকা।  এই রক্ত কণিকার একটি হল অনুচক্রিকা বা প্লেটলেট।সুস্থ স্বাভাবিক মানবদেহে প্রতি মাইক্রোলিটারে ১লাখ৫০হাজার থেকে ৪লাখ৫০হাজার থাকে।এই প্লেটলেট রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে  আক্রান্ত হলে প্লেটলেট কমতে থাকে ,ফলে রক্ত জমাট বাঁধতে সময় নেয় , এতে রক্ত অন্তঃক্ষরণ হয়। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা, রক্তে অক্সিজেনের বহন ক্ষমতা দ্রুত কমতে থাকে।

কি করে বুঝবেন ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে ?

ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ
ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ-ডক্টর’স কথা

জ্বর হলে প্রাথমিক অবস্থায় প্যারাসিটামল খেতে পারেন তাতেও কাজ নাহলে চিকিৎসকের পরামর্শনিন।তবে জ্বর হলে প্রথম তিন দিনের মাথায় ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরী।কারণ প্রথম তিন দিনের NS1পজিটিভ পাওয়া যায় ,সেটা ৫-৬ দিন হয়ে গেলে জটিল তর সমস্যা তৈরি হয়। ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণ হাঁচি ,নাক দিয়ে জলপড়া এগুলো থাকে না।তবে কোনো কিছু আন্দাজে মেনে নিয়ে নিজে চিকিৎসা করতে যাবেন না।

  ডেঙ্গু জ্বর এ হাই ফিভার হয়,  

  • ধুম জ্বর আসবে সাথে ,কখনো কখনো জ্বর এক টানা থাকে,আবার ঘাম দিয়ে ছেড়ে ছেড়ে যাবার পর আবার জ্বর আসতে পারে।
  • অসহ্য মাথা ব্যথা হবে ।
  • পেশীতে গাঁটে ব্যথা থাকবে ।
  • খিদে না পাওয়া , একটা বমি ভাব থাকবে সব সময় ।
  • চোখের সামনে পিছনে ব্যাথা ।
  • গায়ে র‌্যাশ দেখা দিতে পারে ।

 এইসব হলে বুঝবেন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত।দেরী না করে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে যত দ্রুত সম্ভব  রক্ত পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরী।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে কি করণীয়?

ডেঙ্গু জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা ১০৩-১০৫ডিগ্রী পর্যন্ত হয়।সে ক্ষেত্রে রোগীকে শুধুমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে। তাতে জ্বর কমে ,এছাড়াও স্পঞ্জিং করলেও ভালো ফল পাওয়া যায়।অ্যাসপিরিন  বা কোন প্রকার ব্যথা নাশক ট্যাবলেট দেওয়া চলবে না ,এইজাতীয় ওষুধে রক্তক্ষরণ হবার ঝুঁকি থাকে।এছাড়াও দেখতে হবে যাতে শরীরের তাপমাত্রা কোনো ভাবেই ৮০ডিগ্রীর নিচে নেমে না যায়।

 সব রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হবার প্রয়োজন হয় না। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে থেকে চিকিৎসা সম্ভব।ডেঙ্গু যেহেতু ভাইরাস জনিত রোগ সে ক্ষেত্রে রোগীকে আলাদা করে  ৪-৬দিন মশারির ভেতর রাখতে হবে , তা নাহলে ওই রোগীকে যদি আবার মশা কামড়ায় , মশাটিও সেই ডেঙ্গু ভাইরাসটি বহন করবে।সেইমশাটি যদি বাড়ির অন্য সদস্যকে কামড়ায় সেও ডেঙ্গি রোগে আক্রান্ত হবে।ওই মশাটি আবার যখন ডিম পেড়ে ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত মশাদের জন্ম দেবে।এইভাবে ডেঙ্গি মশা দের বংশবৃদ্ধি পাবে।  রোগীকে প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার স্যুপ , ডাবেরজল ,লেবুরসরবত ,জল, ফলেরজুস, প্রচুরপরিমাণে স্যালাইন দিতে হবে। 

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি কতটা ?

 ডেঙ্গু বা ডেঙ্গি রোগে অযথা আতঙ্কিত হবেন না।মৃত্যুর হার খুবই কম।সময় মত ডাক্তারের পরামর্শ ও চিকিৎসা নিলে ১০০ভাগ নিশ্চিত যে সুস্থ হবেন।ডেঙ্গু যেহেতু ভাইরাস জনিত রোগ।আর ভাইরাসের ধর্ম হচ্ছে বার বার তার অবস্থার পরিবর্তন করা , সে ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ,অনেক সময় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সাধারণ লক্ষণ গুলি প্রকাশ পায় না।সাধারণ জ্বর বলে মানুষ অবহেলা করে , ডাক্তার দেখায় না।তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে তখন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এর অবস্থা মারাত্বক পর্যায়ে চলে যায়, যাকে ডেঙ্গি শকসিনড্রোম বলা হয়।দাঁতের মাড়ি , চোখ ,নাক , মুখ ও মলদ্বার দিয়ে রক্ত ক্ষরণ হতে থাকে।সে ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। তা  নাহলে আক্রান্তের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।সাধারণত অ্যাজমা , ডায়াবেটিস , গর্ভবতী মহিলা এছাড়াও অন্যকোনো জটিল রোগ আছে তাদের জন্য ডেঙ্গি রোগ ঝুঁকি পূর্ণ হতে পারে।

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে কি কি করবেন ?

ডেঙ্গুর প্রকোপ মূলত মফঃস্বল বা নগরায়ন এর দিকে বেশি হয়। ডেঙ্গু মশা পরিষ্কার জমা জলে ডিম পাড়ে। 

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে প্রথম কথা মশার কামড় থেকে বাঁচতে হবে।প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে মশা বংশবৃদ্ধি করতে না পারে।সর্বোপরি নিজেদের সচেতন থাকতে হবে।

এডিস মশা পরিষ্কার জলে ডিম পাড়ে ,তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে –

  • বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন – জলাশয় , ড্রেন , জঙ্গল , ঝোপঝাড় কেটে সাফ করুন। বাড়ি, হাসপাতাল ,অফিস – আদালত কাছারি ,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতির আশে-পাশে মশা মারার স্প্রে ব্যবহার করুন।সরকার বা পৌরসভা থেকে মশা নিধক স্প্রে করা হয় রাস্তায়।স্প্রে কালীন অবশ্যই ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে রাখতে হবে ,নাহলে মশা ঘরে ঢুকে যাবে।
  • বৃষ্টির জল জমতে দেবেন না।
  • বাচ্চাদের জন্য বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।বাড়ির বাইরে বা স্কুলে যাবার সময় ফুল হাতা জামা , ফুলপ্যান্ট পড়িয়ে বাইরে পাঠান। সাথে খোলা জায় গায় Odomos জাতীয় ক্রিম বা লোশন লাগিয়ে বাড়ির বাইরে পাঠাবেন।
  • দিনে ,রাতে শোবার সময় মশারি, মশা মারার ধুপ , কয়েল ব্যবহার করুন।এছাড়াও ঘরে অন্য সময় মশা মারার মেশিন জ্বালিয়ে রাখুন।
  • ঘরের জানালায় মশা ঢোকা আটকাতে নেট ব্যবহার করুন।
  • ফ্রিজের জল , কুলারের জল, ফুলদানির জল নিয়মিত পরিবর্তন করুন। 
  • অব্যবহৃত , পরিত্যক্ত পাত্রে জল জমতে দেবেন না।পরিত্যক্ত টায়ার , ডাবের খোলা , প্লাস্টিকের পাত্রে জল যাতে না জমে সেদিকে নজর রাখতে হবে।

একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে ভবিষ্যতে কি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আছে ?

সাধারণত কিছু কিছু রোগের ক্ষেত্রে যে রোগে একবার আক্রান্ত হয় , দ্বিতীয়বার আর সে রোগে আক্রান্ত হয় না।রোগটি বিরুদ্ধে লড়বার জন্য শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায়, তাই আর দ্বিতীয়বার আক্রমণ করতে পারেনা।কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সেটা উল্টো।যে একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় , ভবিষ্যতে তার আক্রান্ত  হবার সম্ভাবনা থাকে এবং দ্বিতীয়বার সেটি মারাত্বক আকার ধারন করে। ২০১৫ সালে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ,গবেষণায় এই তথ্যই পেয়েছে। এর  কারণ বৈজ্ঞানিকরা জানিয়েছেন প্রতিটি ডেঙ্গু সেরোটাইপের মধ্যে কিছু অ্যান্টিজেনিক পার্থক্য থাকে।ভাইরাল স্ট্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তি একই ধরণের অ্যান্টিজেনিক্যালি বিভিন্ন ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে না , বরঞ্চ পুনরায় ডেঙ্গি সংক্রণের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। তাই দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে আরো বিপদ জনক হয়ে ওঠে।

সচেতনতার সাথে ডেঙ্গু মোকাবিলা করুন সুস্থ থাকুন।ডেঙ্গু নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হবেন না।তবে জ্বর হলে উপেক্ষা ,অবহেলা না করে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করুন , নিজে নিজে ,আন্দাজে ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাবেন না।

তথ্যসূত্র: 

সাপ্তাহিকএকতা,BBCনিউজ,গুগল,উইকিপিডিয়া, এনডিটিভি ,dw , আনন্দবাজারপত্রিকা , ফেসবুক ,ইউটিউবওঅন্যান্য