সিজিন চেঞ্জে জ্বর কেন হয়, হলে কি করবেন, কি ওষুধ খাবেন , কখন ডাক্তারদেখাবেন , শিশুদের জ্বর হলে কি করবেন , অ্যান্টিবায়োটিক কখন খাবেন

জ্বর

সিজন চেঞ্জের সময় জ্বর হলে কি করবেন ?

আমাদের প্রধানত ষড়ঋতুর দেশ । ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে অনেক
সময় আমাদের শরীর পেরে ওঠে না ।তখন আমাদের শরীরের সাময়িক কিছু অসুবিধা বা সমস্যা দেখা দেয়। এই বার
বার সিজন চেঞ্জ বা ঋতু পরিবর্তনের ফলে আমাদের শরীরের অসুবিধা বা সমস্যা বা রোগের লক্ষণ হিসেবে জ্বর
হয়।

এই নিবন্ধে আমরা জানবো :
● জ্বর কি ? ( What is fever? in Bangla)
● দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কত ? ( What is the normal body temperature?
in Bangla )
● জ্বরের তাপমাত্রা কত ? ( What is the temperature of the fever?
in Bangla )
● জ্বর কেন হয় ? (Why causes fever?
in Bangla )
● গরমে জ্বর হলে কি করবেন? ( What to do if you have a fever for heat? in Bangla )
● জ্বরের সময় কি করবেন ?( What to do during a fever? )
● জ্বরের সময় স্নান করা উচিত কি না ? ( Should I take a bath during fever?
in Bangla )
● জ্বর সারাতে কি ওষুধ খাবেন ?( Do you take medicine to cure fever?
in Bangla )
● অ্যান্টিবায়োটিক কখন খাওয়া উচিত ? ( When should I take antibiotics?
in Bangla )
● শিশুদের জ্বর হলে কি করবেন ?( What to do if children have a fever
? in Bangla )
● জ্বরে কখন ডাক্তার দেখাবেন ?
( When to see a doctor for fever? in Bangla in Bangla )

জ্বর কি ?

জ্বর হল শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ।
জ্বরকে পাইরক্সিয়া ও বলা হয়ে থাকে।
কিছু কারণ বশত শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৭-১০০( F) এর মাত্রা ছাড়িয়ে গেল শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে
যায় তাকে জ্বর বলি।

দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কত ?

একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৭-১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা (৩৬-৩৭
ডিগ্রী সেলসিয়াস ) এর মধ্যে থাকে।
তবে স্থান ভেদে , কোন কাজ কর্ম করলে বা ব্যয়াম করলে বা থাইরয়েড জাতীয় রোগ থাকলে তাপমাত্রার
হেরফের হতে পারে ।

সিজিন চেঞ্জে জ্বর কেন হয়, হলে কি করবেন, কি ওষুধ খাবেন , কখন ডাক্তারদেখাবেন , শিশুদের জ্বর হলে কি করবেন , অ্যান্টিবায়োটিক কখন খাবেন ।
Mouth Thermometer

জ্বরের তাপমাত্রা কত ?

দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় তখন তাকে জ্বর বলা হয়।
শরীরের তাপমাত্রা এবং সময়সীমার উপর নির্ভর করে জ্বরের তীব্রতা।

তাপমাত্রার তারতম্যের উপর ভিত্তি করে জ্বরকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়।
১০০.৫ – ১০২.১ ( F) অথবা ৩৮.১–৩৯ ( C ) লো গ্রেড জ্বর।
১০২.২–১০৪ (F) অথবা ৩৯.১–৪০ ( C ) মডারেট জ্বর।
১০৪.১–১০৬ ( F ) অথবা ৪০.১—৪১.১ (C ) হাইফিভার বা জ্বর
১০৬ ( F ) অথবা ৪১.১ (C ) বেশি হলে হাইপার ফিভের বা জ্বর

আবার সময়সীমার ভিত্তিতে সাত দিনের কম স্থায়ী হলে অ্যাকিউট ফিভার।
এবং অ্যাকিউট ফিভার বেড়ে যদি ১৪ দিন অবধি থাকলে সাব-অ্যাকিউট ফিভার ।
এছাড়াও ১৪ দিনেরও বেশি স্থায়ী হলে ক্রনিক বা পারসিস্ট্যান্স ফিভার ।

জ্বর কেন হয়?

শরীরে কোনরকম ইনফেকশনের কারণে জ্বর হয় । শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কোনো ভাইরাস ,
ব্যাকটিরিয়া বা জীবাণুর বিরুদ্ধে যখন লড়াই করে তখন আমাদের জ্বর হয়। এটি যেহেতু রোগের লক্ষণ ।

তাই কোনো জটিল , বড় ধরনের রোগে আক্রান্ত হবার পূর্বেই জ্বর তাকে শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে লড়াই করে
দেহকে সুস্থ রাখে।

অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ জ্বর হওয়াকে শরীরের পক্ষে ভালো মনে করা হয়। মূলত দেহের শ্বেত রক্ত
কণিকা দেহের ক্ষতিকারক ভাইরাস , ব্যাকটিরিয়া বা জীবাণুকে নাশ করে। তাতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ
ক্ষমতা বেড়ে যায়। শারীরিক অনিয়মের কারণেও ফিভার হয়ে থাকে আবার নিজে থেকেই ওষুধ ছাড়ায় সেরে ওঠে।

এটা মূলত শ্বেত রক্ত কণিকা আমাদের দেহে সফল ভাবে ক্ষতিকারক ভাইরাস , ব্যাকটিরিয়া বা জীবাণুর সাথে
সফল ভাবে লড়াইয়ে সক্ষম হয়। ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আমাদের শরীর যদি
প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ,তাহলে দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

জ্বরে কখন ডাক্তার দেখাবেন?

● জ্বরের সাথে যখন তীব্র মাথাব্যথা থাকবে।
● জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা অধিক থাকলেও ঘাম হবে না। কিন্তু, বেড়ে ১০৪ ডিগ্রির বেশি হয়ে গেলে দ্রুত
ডাক্তারের কাছে যান।
● জ্বরের সাথে খিঁচুনি হলে।
● শরীরে জ্বর থাকাকালীন ঘাড় শক্ত হয়ে থাকলে।
● ফিভার থাকাকালীন মনের মধ্যে দ্বিধা ভাব আসবে কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে।
● জ্বরের সাথে বমি ,ডায়রিয়া হলে।
● শরীরের মধ্যে সবসময়একটা অস্বস্থি ভাব।
● শরীরের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ প্রকাশ পেলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
এ ছাড়াও ভাইরাল ফিভার বা জ্বর হলে ডাক্তার দেখানো জরুরি ।

কি করে বুঝবেন সাধারণ জ্বর আর কোনটা ভাইরাল জ্বর?

● অকারণে শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগা ভাইরাল ফিভারের অন্যতম লক্ষণ। যদি ক্লান্তিতে আপনা
শরীর ভেঙে আসে, পাশাপাশি জ্বরও থাকে, তাহলে জানবেন, আপনি ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত।

● শরীরে ব্যথার সাথে জ্বর, ক্লান্তির পাশাপাশি মাংস পেশীতে ব্যথা ও কাশি থাকলে।

● জ্বর, গায়ে ব্যথা, সর্দি কাশি, সঙ্গে মাথার যন্ত্রণা ।

● চোখে একটা অস্বস্তি ভাব। চোখ জ্বালা করা , চোখ লালও হয়ে যাওয়া, চোখ থেকে জল পড়া এগুলি
ভাইরাল জ্বরের লক্ষণ।

গরমে জ্বর হলে কি করবেন ?

শীত শেষে হটাৎ করে গরম পড়তেই, গরমের শুরুতেই জ্বর হলে কি করবেন ? সিজন চেঞ্জ বা ঋতু
পরিবর্তনকালীন এই সময় এটি স্বাভাবিক। গরম পড়লেই ফ্রিজের ঠাণ্ডা জল , বাড়ি ফিরে এসেই স্নান
। যখন ঘরে বা অফিসে থাকছেন এসি তে তারপর বাইরে বেরোলেই রোদের গরম, এতেই ঠাণ্ডা লেগে যায়।


আর তাতেই যাদের অ্যালার্জির প্রবণতা রয়েছে বা সর্দি-কাশির ধাত রয়েছে, তাদের তো চট করে ঠান্ডা লেগে
গা-হাত-পা ম্যাজম্যাজ, তার পরই জ্বর চলে আসছে। বিশ্রাম নিন ,বেশি করে জল খান ,জ্বর বেশি বাড়লে
প্যারাসিটামল খান তাতেই জ্বর সেরে যাবে।


● যদি লক্ষ করেন বেশিদিন স্থায়ী হচ্ছে ,কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে তাহলে ডাক্তার দেখিয়ে রক্ত পরীক্ষা
করিয়ে নিন। ঋতু পরিবর্তন ছাড়াও অন্য কারণে জ্বর আসতে পারে । রক্ত পরীক্ষা করলে সঠিক
কারণ জানা যাবে।


● জীবাণুর সংক্রমণের জন্য জ্বর হলে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে অ্যান্টিবায়োটিক খান ,সাথে ভিটামিন
খেতে পারেন তাহলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে না।


● হালকা গলা খুসখুস ভাব , ঢোক গিলতে গেলে গলায় লাগছে এরকম হলে নুন জলে গার্গল করুন । তবে
টনসিলের সমস্যা থাকলে ডাক্তার দেখিয়ে নেবেন।


● বাইরে রোদ গরম থেকে এসেই ফ্রিজের ঠান্ডা জল গলায় ঢালবেন না। গরম পরার সাথে সাথেই এসি
চালিয়ে শোবেন না । হাল্কা সুতির জামা পড়ুন , ছাতা, সানগ্লাস ব্যবহার করুন । গরমে ঘামের সাথে জল
বেরিয়ে যায় , শরীর জলের অভাবে নেতিয়ে পড়ে। তাই বেশি করে জল খান । ডাবের জল খান।

● বাইরের শরবত আর কাটা ফল এড়িয়ে চলুন , এতে ডায়রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

● বাইরে রোদ গরম থেকে এসেই ফ্রিজের ঠান্ডা জল গলায় ঢালবেন না। শরীরে ঘাম জমতে দেবেন না ।
বাইরে থেকে এসে স্নান করে নিন।


● যাদের ঠাণ্ডা লাগার সমস্যা আছে তারা ভিজে গামছা বা তোয়ালে দিয়ে ভালো করে গা মুছে নিন।

● জ্বরের মুখে তো কিছু খেতেই ইচ্ছে করে না সেক্ষেত্রে দু ঘন্টা অন্তর অন্তর বারে বারে খান। যা
খেতে ইচ্ছে করবে তাই খান না হলে শরীর দূর্বল হয়ে পড়বে।
ছোটো মাছের হালকা কালোজিরে দিয়ে ঝোল , শুক্তো বানিয়ে ভাতের সাথে খান । বাটার এর মধ্যে রসুন
ভেজে পাউরুটির এপিঠ ওপিঠ সেঁকে খান এতে করে মুখের স্বাদ ফিরবে। মাংসের স্টু বানিয়ে খান।

● জ্বরের মাত্রা অধিক হলে দিয়ে মাথা ধুয়ে ভালো করে মুছে নিন। কপালে জলপট্টি দিন।


● রুমালের মধ্যে বরফ নিয়ে কুঁচকি, বগলের তলায় চেপে ধরে রাখুন । এতে করে শরীরের তাপমাত্রা কমে
যাবে । এতে যদি কমার কোনো লক্ষণ দেখতে না পান । তখন ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

বর্ষায় জ্বরঃ

বর্ষাকালে সিজন চেঞ্জ বা ঋতু পরিবর্তনকালীন জ্বর হতে পারে। বর্ষায় ভ্যাপসা
আবহাওয়ায় বৃষ্টির সময় ঠাণ্ডা আবার , রাতের দিকে বৃষ্টি হলে গায়ে চাদর ঢাকা দিতে লাগে আবার সকাল
থেকে কাঠফাটা রোদ। এইরকম ঠাণ্ডা গরম ওয়েদারে ঠাণ্ডা গরম জনিত কারণে জ্বর হয়ে থাকে।

আবার বর্ষায় হুট করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে গেল। এইরকম বিনা প্রস্তুতিতে পড়ে বৃষ্টিতে ভিজতে হয় , আবার সারাদিন গুড়ি
গুড়ি বৃষ্টি লেগেই থাকে । এইরকম বৃষ্টিতে ভিজেও জ্বর হয় ।
আচ্ছা আমরা তো রোজ নদীর জল , পুকুরের জল ,কুয়োর জল ইত্যাদি জলে স্নান করি ।তাহলে বৃষ্টির জলে
ভিজলে ঠাণ্ডা লেগে যায় কেন !

আমরা প্রতিদিন স্নানের পর গা মাথা ভালো করে মুছে নি , তারপর শুকনো জামা কাপড় পড়ি , কিন্তু বৃষ্টিতে
ভিজলে তৎক্ষণাৎ সেই উপায় থাকে না , ভিজে জামা কাপড় গায়ের মধ্যেই শুকিয়ে যায় । ফলে ঠাণ্ডা লাগে।
প্রতিদিনের ব্যবহৃত জলের থেকে বৃষ্টির জল অধিক ঠাণ্ডা হয় ।

হঠাৎ করে গায়ে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা জল পড়লে শরীরের তাপমাত্রার বড় পরিবর্তন আসে, যেটা খুব কম সময়ের মধ্যে নার্ভাস সিস্টেম কাছে একটি
ইলেক্ট্রিক শক’ এর মত ধাক্কা খায়। আমাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিস্কের
হাইপোথ্যালামাস গ্রন্থি । নার্ভাস সিস্টেমে ঠাণ্ডাজনিত কারণে শক লাগার ফলে , নার্ভাস সিস্টেম বুঝে উঠতে
পারে না , ফলে ছোট ছোট শিরাগুলো সাময়িক কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয়।

সেইমূহর্তে তাপমাত্রা কমানো বা বের করে দেওয়া অসম্ভব হয়ে যায়। শরীরের তাপমাত্রা ভেতরেই আটকে থেকে যায়, যার বহিঃপ্রকাশ হল জ্বর।
এছাড়াও বর্ষায় ভাইরাল জ্বর হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এছাড়াও ডেঙ্গি , ম্যালেরিয়া প্রভৃতি রোগে জ্বর হয়ে থাকে।

শীতকালীন জ্বরঃ

মূলত আমাদের গ্রীষ্ম প্রধান দেশ। প্রায় তিনমাসের ঠান্ডায় আমাদের কাবু করে দেয় । এই তিন মাস উত্তরের
ঠাণ্ডা বাতাস বয় , ফলে আমাদের ঠাণ্ডা লেগে যায়। শীতকালে প্রায় প্রত্যেক ঘরে ঘরে এবং প্রায় প্রত্যেকেই
ঠাণ্ডা লাগা জনিত জ্বরে একবার না একবার ভুগবেই।

বিশেষত শিশুদের এবং বয়স্কদের ঠাণ্ডালাগা জনিত জ্বরের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। এইসময় যত সম্ভব ঠাণ্ডা
না লাগানোই ভালো । বাচ্চারা বাইরে বেরোবেই , ধুলো বালিতে খেলবেই সেক্ষেত্রে বাচ্চাদের সবসময় ফুল হাতা
জামা, ফুল প্যান্ট পড়িয়ে রাখুন।

শীতে সকালে খালি পেটে মধুর সাথে মিশিয়ে তুলসী পাতার রস খান। রোজ সকালে আদার রস , তুলসী পাতা ফুটিয়ে মধু দিয়ে লিকার চা বানিয়ে খান ,এতে করে শীতে ঠান্ডা লাগার চান্স কম থাকবে। এটা বাচ্চা থেকে বয়স্ক সবাই খেতে পারেন। ভিটামিন সি জাতীয় ফল মূল , শাক সবজি বেশি করে খান।
ঠাণ্ডা হাওয়ার প্রকোপ থেকে বাঁচতে সোয়েটার , মাফলার , টুপি পড়ে থাকুন ।

জ্বর হলে কি করবেন ?

প্রচুর পরিমাণে জল খান

সাধারণ ঠাণ্ডা লাগা থেকে ভাইরাল ফিভার হলে , বা যেকোন জ্বর হলে বেশি করে জল খান।
শীতকালে এমনিতেই কম জল খাওয়া হয় , তৎপর আবার ঠাণ্ডা লাগলে তো আর কথায় নেই । জল খাওয়া বলতে
শুধু গলা ভেজানো আর কি ! এমনটা করবেন না , জ্বর হলে বেশি করে জল খেতে হবে ।

ঠাণ্ডা জল খেতে ইচ্ছে না করলে একেবারে অনেকটা জল অল্প গরম করে ফ্লাস্ক এ ঢেলে রেখে দিন ওটা বারে বারে খান। সাথে
তরল জাতীয় খাবার, সুপ , ডাবের জল প্রভৃতি খান । শীত গ্রীষ্ম বর্ষা নির্বিশেষে সিজন চেঞ্জের ফলে যখনই
জ্বর হবে , প্রচুর পরিমাণে জল খান।

জ্বরের কারণে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে শরীর ডিহাইড্রেট হাওয়ার প্রবণতা থাকে , তাই শরীরে পর্যাপ্ত জলের প্রয়োজন। এ ছাড়াও জল শরীর থেকে ক্ষতিকর জীবাণু ও অন্যান্য উপাদান শরীর থেকে বের করতে সাহায্য করে। তাই জ্বর হলে বেশি করে জল খান।

জ্বর হলে বিশ্রাম নিন

জ্বর হলে বিশ্রাম নিন। এসময় যত বেশি কাজকর্ম করবেন শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে।
তাই জ্বর এর সময় শরীরকে বিশ্রাম দিন ,এতে তাড়াতাড়ি তাপমাত্রা কমবে।
অধিক তাপমাত্রায় জ্বরের সঙ্গে শরীরের অন্যান্য উপসর্গ যেমন – মাথা-ব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে থাকা, বমি হওয়া ,
ডায়রিয়া হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

জ্বর হলে কি স্নান করা উচিত ?

জ্বর হলে অনেকেই স্নান করেন না , ঠাণ্ডা লেগে যাওয়ার ভয়ে । একটাই জামাকাপড় পড়ে থাকেন দু তিনদিন
ধরে । পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন না ,এমনটা করবেন না । জ্বরে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যায় , ওই ঘামা কাপড়
চোপড় পড়ে থাকলে জ্বরের জীবাণু শরীরের মধ্যেই রয়ে যাবে , আবার ওটা থেকে জ্বর ফিরে আসবে ।

শরীরে ঘাম জমতে দিবেন না । তাই এইসময় বেশি জল না-ঘেঁটে কুসুম গরম জলে স্নান করে ভালো করে গা মাথা মুছে
হালকা রোদে শুকিয়ে নিন। তা-নাহলে গরম জলে গামছা বা তোয়ালে ভিজিয়ে স্পঞ্জ করে নিন। তাতে শরীরের
তাপমাত্রা কমবে।

রোজ জামা কাপড় বদলান। বিছানার চাদর ও বালিশের কভার নিয়মিত পাল্টাতে পারলে ভালো হয় । না হলে সুস্থ্য হয়ে এগুলো পাল্টে ফেলুন এবং পরিষ্কার কাচা চাদর , বালিশের কভার ব্যবহার করুন।
সকালের দিকে না হয় গোসল করে নিলেন তারপর সন্ধ্যেই বা রাতের দিকে তাপমাত্রা অধিক বৃদ্ধি পেলে কি
করবেন ?

ওষুধ খাওয়ার পরেও যদি শরীর অধিক গরম থাকে তাহলে কপালে জলপট্টি দিন। গরম জলে ভিজা তোয়ালে দিয়ে
হাতের তালু , পায়ের তলা মুছে নিবেন ,এতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে আসবে।

দ্রুত জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল খান

জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমাতে প্যারাসিটামল খান। সারাদিনে সর্বোচ্চ দুটো (৬৫০) করে খান।
অনেকের প্যারাসিটামল খেলে শরীর দূর্বল হয়ে পড়ে , সেক্ষেত্রে প্যারাসিটামলের সাথে ভিটামিন জাতীয় ওষুধ
খান ।এতে শরীর দূর্বল লাগবে না। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল , শাক সবজি খান।

ঠাণ্ডা লাগা জনিত কারণে জ্বর হলে লেবুর রস , কমলা লেবু , মুসাম্বি লেবু কাঁচা লঙ্কা খান এতে প্রচুর
পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। ভিটামিন সি ঠাণ্ডা লাগা আটকাতে সাহায্য করে।

অ্যান্টিবায়োটিক কখন খাবেন?

অ্যান্টিবায়োটিক কখনই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না। ভাইরাল ফিভার হলে সাধারণত চিকিৎসকেরা
অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে থাকেন।
এটি আমাদের শরীরের রোগ বহনকারী ক্ষতিকারক ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়াগুলিকে ধ্বংস করে ।

অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সাধারণত ৫ দিন, ৭ দিন, ১০ দিনের হয়ে থাকে। এই নির্দিষ্ট সময় ধরে ভাইরাস
,ব্যাক্টেরিয়া গুলিকে নির্মূল করতে সক্ষম হয়। যদি কোর্স সম্পূর্ণ না করে সাময়িক সুস্থ হলে অপ্রয়োজন বলে বন্ধ করে দি, তাহলে সব ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়া মরে না । শরীরের মধ্যেই সাময়িক নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বেঁচে থাকে। আস্তে আস্তে জেনেটিক মিউটেশন ঘটিয়ে আবার সংখ্যায় বেড়ে কিছুদিন বাদে
তারা আবার আত্মপ্রকাশ করে শরীরকে অসুস্থ করে তোলে।

তখন যদি আবার আগের ডাক্তারের দেওয়া
অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করি তখন আর ওষুধে কাজ করে না , কারণ ওই ওষুধের সাথে শরীরের মধ্যে বেঁচে
যাওয়া ভাইরাস , ব্যাকটেরিয়া গুলো লড়াই করে জিতে যাওয়ার উপায় বের করে ফেলেছে। তাই অবশ্যই
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স সম্পূর্ণ করে খান।

মুড়ি মুড়কির মত অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না । এতে শরীরের মারাত্বক ক্ষতি হয়। অনেকসময় শরীর অন্য ওষুধ কাজ করা বন্ধ
করে দেয় অধিক অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে। সর্বদা ডাক্তারের নির্দেশ মেনে সঠিক ডোজ এ অ্যান্টিবায়োটিক খান।

শিশুদের জ্বর হলে কি করবেন ?

ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে শিশুদের ভাইরাস জনিত কারণে ,অ্যালার্জি থাকার জন্য,ব্যাকটেরিয়ার
সংক্রমণের ফলে অথবা ঠাণ্ডা জনিত কারণে জ্বর হয়ে থাকে । শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম
থাকার জন্য অল্পতেই তাপমাত্রা হটাৎ করে বেড়ে ১০৩ ,১০৪ ,১০৫ হয়ে যেতে পারে ।

শিশুদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের কাছে তো অবশ্যই যাবেন । সাথে বাড়িতে বিশেষ করে ঠাণ্ডা জনিত কারণে গরম জলে লেবুর রস , মধু
, তুলসী পাতার রস মিশিয়ে খাওয়াতে পারেন। তুলসী পাতা ,মধুর মধ্যে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল অ্যান্টি ভাইরাল
প্রভৃতি সব উপাদান থাকে , যা সহজেই শরীর থেকে ভাইরাস , ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণু শরীর থেকে বের
করে দেয় । ফলে শরীরের তাপমাত্রা কমতে সাহায্য করে।

এ ছাড়া শিশুর বয়স এবং ওজন ভেদে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নূন্যতম 6 ঘণ্টা পর পর প্যারাসিটামল সিরাপ
খাওয়ানো যেতে পারে । যেসব শিশুদের ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথ ঘন ঘন জ্বর হয় , সেক্ষেত্রে
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সিরাপ এবং সাপজিটার বাড়িতে সারাবছর ফ্রিজের নরমাল
টেম্পারেচার রেখে দিতে পারেন।

অনেকক্ষেত্রে, বাচ্চাকে ওষুধ খাওয়ানোর পর ও শরীরের তাপমাত্রা কমে না, সেক্ষেত্রে গরম জলে তোয়ালে বা
গামছা ভিজিয়ে গা মুছিয়ে দিন। তাহলে জ্বর দ্রুত নেমে যাবে। বিশেষ করে ঠাণ্ডা জনিত হলে , সেক্ষেত্রে
সাতদিনের বেশি থাকা ,অথবা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

সাধারণত 6 মাস থেকে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জ্বরের মাত্রা অনেক বেড়ে গেলে খিঁচুনি হলে অবশ্যই
হাসপাতালে শিশুকে নিয়ে যান। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদী ফিভার হলে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে ।

তিন থেকে চার দিন জ্বর থাকলো সেরে গেল এবং আবার এলো, শিশুর দেহে জটিল সমস্যা বা রোগ থাকলে এইরকম জ্বর হয়। হাড়ের রোগ, ক্যান্সার , ফুসফুসের রোগ বা অন্য কোনো জটিল রোগ থাকলে এইরকম দীর্ঘ মেয়াদী জ্বর হয়।

৩-৩৬ মাস বয়সী শিশুদের সাধারণত স্ট্রেপটো নিউমোনিয়া, নাইসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস, সালমোনেলা,
স্টেফাইলো ইত্যাদি জীবাণুর মাধ্যমে জ্বর হতে পারে। এছাড়াও বাচ্চাদের প্রতিষেধক টিকা নেওয়ার পর জ্বর আসে।

শিশুদের ক্ষেত্রে যখন চিকিৎসক জরুরি

বাচ্চাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি কম, তাই
জ্বর হলে সতর্ক হোন। শিশুর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে শিশুর বয়স অনুযায়ী এর বিভিন্ন উপসর্গ দেখা যায়।
এক বছরের কম বয়সের শিশুঃ শিশুর তিন মাস বয়সের মধ্যে ১০০.৪ ( F)
জ্বর হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৩ থেকে ৩৬ মাস বয়সের শিশুর জ্বরঃ তিন থেকে ছয় মাসের বাচ্চার ১০২ (F) , বা তার বেশি জ্বরে, সাথে শিশু ঘুমকাতুরে কিংবা অত্যন্ত কান্নাকাটি
করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

তিন বছরের বেশি বয়সের শিশুর জ্বরঃ ছয় মাস থেকে দুই বছরের শিশুদের ১০২ (F) জ্বরে সাথে ডায়রিয়া, বমি এবং ত্বকের ‘র‌্যাশ’ হলে
অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

জ্বর হলে শরীরের সাময়িক কিছু অসুবিধা থাকে ঠিক কথা । কিন্তু এতে বিরক্ত হবেন না ।
বিশ্রাম নিন , পরিবারের সাথে বাড়িতে সময় কাটান। তাই সিজন চেঞ্জের ফলে কখনো সখনো জ্বর হওয়া ভালো।
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

তথ্য সূত্র

প্রথম আলো , printo.it,bd news 24.com ,কোরা , আনন্দবাজার পত্রিকা , উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য