জন্ডিস-Jaundice

জন্ডিস

 জন্ডিস সম্মন্ধে সম্পূর্ণ  আলোচনা

Jaundice (জন্ডিস) শব্দটি ফরাসি শব্দ Jaunisse, থেকে এসেছে যার অর্থ হলুদাভ। স্বল্প মেয়াদী  লিভারের রোগের লক্ষণ হল জন্ডিস। জন্ডিস আবার ইক্টেরাস (icterus) নামেও পরিচিত। এক্ষেত্রে বিশেষ কিছু রোগের লক্ষণের বাহ্যিক প্রকাশ চোখ ,প্রস্রাবের রঙ হলুদ হয়ে যাওয়া, তাই শরীরের হলুদ লক্ষণকে জন্ডিস বলা হয়।

এইনিবন্ধে  জন্ডিস সমন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করব।একই সাথে জন্ডিসের সাথে ভ্রান্ত কিছু ধারণা যুগ যুগ ধরে প্রচলিত হয়ে আসছে , সেসব ভ্রান্তির অবসান করবো এইনিবন্ধে।

এইনিবন্ধের আলোচিত বিষয় গুলি হল :

  • জন্ডিস কি এবং কেন হয় ? ( What is jaundice and why causes this ? )
  • জন্ডিস কতপ্রকার ? ( How many types of jaundice? )
  • জন্ডিস হলে কি করণীয়? ( What to do if you have jaundice? )
  • জন্ডিসের লক্ষণ গুলি কি কি ? ( What are the symptoms of jaundice? )
  • গর্ভবতী মায়েদের জন্ডিস ( Jaundice of pregnancy time )
  • নবজাতকের জন্ডিস ( Newborn Jaundice )

জন্ডিস কি এবং কেন হয় ?

জন্ডিসের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত বিলিরুবিন। মূলত লিভারের স্বল্প মেয়াদী ক্ষতির ফলে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলেই জন্ডিস হয়। তাই সর্বপ্রথমে বিলিরুবিন কি এটা জেনে নেওয়া যাক।

বিলিরুবিন কি?

বিলিরুবিন হল হলুদ রঙের এক প্রকার রঞ্জক পদার্থ। রক্তের লোহিত কণিকা (১২০দিন) ভেঙে হিমোগ্লোবিনে পরিণত হয়।হিমোগ্লোবিন ভেঙে হিম (heme) এবং গ্লোবিন (globin) এ পরিণত হয়। গ্লোবিন ভেঙ্গে অ্যামাইনো অ্যাসিডে পরিণত হয়।হিম ভেঙে আয়রন এবং বিলিভারদিনে পরিণত হয়। হিম, হিমি-অক্সিজেনিসের (heme oxygenase) সাথে বিক্রিয়া করে বিলিরুবিনে তৈরি হয়। পরবর্তীকালে এই বিলিরুবিন আমাদের যকৃতে (liver)  জমা হয় তারপর সেটা আমাদের খাদ্যনালী , প্রস্রাব এবং মলের সাথে শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসে। বিলিরুবিনের স্বাভাবিক মাত্রা (১.২ mg/dl) কিন্তু যখন বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায় সেটার পরিমান বেড়ে ( ৩ mg/dl) হয়।কোনো কারণে যকৃতের সাময়িক সমস্যা হলে বিলিরুবিন সঠিক ভাবে আমাদের শরীর থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনা। জমতে থাকে শরীরের মধ্যে।তখন আমাদের শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা অতিরিক্ত হয়ে যায়। লিভার বা যকৃতের এই সাময়িক সমস্যাই হল জন্ডিস।

জন্ডিস প্রধানত তিন প্রকারের হয় –

( ১ ) হেমোলাইটিক জন্ডিসঃ  রক্তে কিছু সময় পর স্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধ লোহিত কণিকা ভেঙে (১২০দিন) নতুন লোহিত কণিকা তৈরি হয়। কোনো কারণে লোহিত কণিকা অধিক পরিমাণে ভাঙলে এই জন্ডিসে আক্রান্ত হয়।

(২) হেপাটোসেলুলার জন্ডিসঃ  যকৃতের কোষের কাজ হল বিলিরুবিনকে পিত্ত রসে পরিণত করা।লিভার বা যকৃত কোষের সমস্যা হলে এই কাজ ব্যাহত হয় তখন তাকে হেপাটোসেলুলার জন্ডিস বলে।

(৩) অবস্টাকটিভজন্ডিসঃ পিত্ত নালীর মধ্যে পাথর বা পিত্ত থলির মধ্যে পাথর অথবা কোন টিউমারের জন্য বিলিরুবিন বাইরে বেরিয়ে আসার পথে বাধা প্রাপ্ত হয়। তখন লিভারের কাজ কর্ম ব্যাহত হয় তাকে অবস্টাকটিভ জন্ডিস বলে।

জন্ডিস থেকে বাঁচতে কি  করণীয় ?

(১)সব সময় ফোটানো বিশুদ্ধ জল খেতে হবে।বাইরের খাবার যত সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।তেল মশলাদার খাবার যত সম্ভব কম খাওয়াই ভালো।

(২) রক্ত পরীক্ষা করার সময় সচেতন থাকতে হবে ,যাতে প্রতি বার নতুন সিরিঞ্জ ব্যবহার করে।যদিও এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য কর্মীরা যথেষ্টস চেতন , তবুও মায়ের থেকে একজন শিশুর যত্ন ভালো কে নিতে পারে ?তাই বাড়তি সচেতনতার সাথে এটি নিশ্চিত হতে হবে।

(৩) গর্ভধারণের আগে হেপাটাইটিস-বি বা ওই জাতীয় আছে কিনা পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।

(৪) জন্ডিসে মা আক্রান্ত হলে কোন রকম ঝুঁকি না নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।এছাড়াও হেপাটাইটিস, টিভি ও অন্যান্য পুরোনো জটিল রোগ থাকলে জন্ডিস হলে তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

জন্ডিস হবার সম্ভাব্য কারণ গুলি কি কি?

  • প্রাণি বাহিত ভাইরাস যেমন হেপাটাইটিস A , B ,C,E  এর জন্য লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে ।
  • পেটের কোনো ইনফেকশন থাকলে।
  • হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার্য জিনিস পুনরায় ব্যবহার করলে সেই রোগে আক্রান্ত হলে। যেমন সেলুনে ,পার্লারে চুল দাড়ি কাটা , নাক কান ফুটো করার সময় সুঁই জীবাণুমুক্ত করা এবং  ক্ষুর , ব্লেড  নতুন করে ব্যবহার করার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। 

কি করে বুঝবেন যে জন্ডিস হয়েছে ?

যেহেতু ভাইরাসের জন্য যকৃতে সাময়িক রোগ হয় ,সেহেতু রোগের লক্ষণ হিসেবে জন্ডিসে

জ্বরহয় ,শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে,শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ পতঙ্গে ব্যাথা হয় , পেটে ব্যথা হয় ,বমি বমি ভাব ,বা বমি হতে পারে , খাওয়া অরুচি হতে পারেআস্তে আস্তে চোখ হলুদ হয়ে যায়

জন্ডিস কতপ্রকার ? ( How many types of jaundice?
জন্ডিস কতপ্রকার ? ( How many types of jaundice?

জন্ডিসে কি করবেন আর কি করবেন না ?

(১) লিভার যেহেতু  খারাপ হয়েছে ,সেহেতু বেশি মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলায় ভালো।তার মানে এই নয় রুগীকে এক দম সব সিদ্ধ সিদ্ধ খাবারই খেতে হবে।

(২) রোগীকে সব ধরনের স্বাভাবিক খাবার দেওয়ার চেষ্টা করবেন। যদি খাবার ইচ্ছে না থাকে স্যুপ , খিচুড়ি খাওয়াতে পারেন।কিন্তু রোগীর অবস্থা যদি খুব খারাপ থাকে, খাবার খেতে পারছে না বমি হয়ে যাচ্ছে, তাহলে হসপিটালে ভর্তি করতে হবে।

(৩) অনেক সময় প্রচুর জল খেতে বলা হয় এটি করবেন না স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় জল খেলে লিভারের উপর চাপ পড়বে। সে ক্ষেত্রে পেট ফুলে থাকতে পারে। পেটে ব্যথা অনুভব হয়। তাই স্বাভাবিক জল খাবেন, মাত্রাতিরিক্ত  জল খাবেন না। জলে পরিমাণ মত গ্লুকোজ মিশিয়ে খেতে পারলে ভালো হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম নিতে হবে।

 (৪) লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হবার লক্ষণ হল জন্ডিস। তাই কোন প্রকার ঝাড়ফুঁক, গাছগাছালি, মালাপরা , হাতে ঘষে হলুদ জল বের হওয়া এই কুসংস্কারে বিশ্বাস করবেন না। শরীর খারাপ হলে বা শরীরের লক্ষণ দেখে জন্ডিস হয়েছে বুঝতে পারলে দ্রুত ডাক্তার দেখিয়ে, ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন।

জন্ডিস হওয়া মানেই কি হেপাটাইটিস B হয়েছে ?

হেপাটাইটিস হল যকৃতের প্রদাহ বা সংক্রমন।এই হেপাটাইটিস যদি কোনো ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন তাকে বলে ভাইরাল হেপাটাইটিস। এই ভাইরাস গুলি হল হেপাটাইটিস A, B,C, এবং E।

হেপাটাইটিস B দ্বারা যখন  সংক্রমিত হয় তখন তাকে বলে হেপাটাইটিসবি।

৭০-৮০% হেপাটাইটিসবি এর কোনো উপসর্গ থাকেনা।

এছাড়াও লিভারের  অ্যাকিউট এবং ক্রনিক এই দুটি দীর্ঘ মেয়াদি জটিলতা হয়ে থাকে।

অ্যাকিউট – যেটা ৬মাসের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।

ক্রনিক- ৬মাসের পরও যদি শরীরের মধ্যে সংক্রমণটা থাকে সেটা হল ক্রনিক।

সদ্যোজাত বাচ্চা বা নবজাতকের জন্ডিস

সাধারণ ভাবে বড়দের জন্ডিসের সাথে নবজাতক বা সদ্যোজাতের জন্ডিসের আকাশ পাতাল তফাৎ। নবজাতকের জন্ডিস কেন হয় ,চলুন জেনে নেওয়া যাক:

নবজাতক বা সদ্যোজাত বাচ্চাদের চোখ ও গায়ের রং হলুদ হলে বুঝতে হবে ,বাচ্চাটির শরীরবৃত্তীয় কোনো সমস্যা হচ্ছে।যাকে আমরা বলে থাকি জন্ডিস। এছাড়াও বাচ্চারপেটফেঁপে থাকে , বাচ্চা খেতে চায়না , ঝিমিয়ে থাকে এগুলি দেখে বুঝতে হবে বাচ্চার আক্রান্ত ।

মনে রাখতে হবে বাচ্চা জন্মানোর ২-৩দিন পর বাচ্চার জন্ডিসের পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

 নবজাতকের এটি খুবই সাধারণ ব্যাপার ভেবে বসে থাকলে চলবে না। দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।এক্ষেত্রে বাচ্চাদের জন্ডিসের কয়েকটি প্রকারভেদ  আছে। যেমন : 

 ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস:

  এটি খুবই সাধারণ একটি জন্ডিস  ,যা সদ্যোজাত বাচ্চাদের হয়ে থাকে। নবজাতকের  লিভার পুরোপুরি তৈরি হয়না ,সেক্ষেত্রে লিভার বিলিরুবিন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। তার ফলে এটি হয়।শারীরিক লক্ষণ দেখে তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। ডাক্তার যদি ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস নিশ্চিত করে তাহলে এতে ভয়ের কিছু নেই।জন্ডিস হলে বাচ্চাকে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর মায়ের দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি। সাথে সূর্যের আলো প্রয়োজন।তাই বাচ্চাকে একটু সকালের নরম রোদে রাখতে হবে। তাতে করে বাচ্চার অতিরিক্ত বিলিরুবিন পায়খানা ,প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যাবে।

Term (৩৭-৪০সপ্তাহেরমধ্যে) বাচ্চা হলে জন্মের ৩-৪দিন জন্ডিস হয়। Pre-term ( ৩৭সপ্তাহেরআগে) বাচ্চা হলে জন্মের ৫-৭দিনের মধ্যে জন্ডিস হয়। এতে ভয় পাবার কোনো কারণ নেই , এটি শরীরবৃত্তীয় কারণে হয়ে থাকে।

ব্রেস্ট ফিডিং জন্ডিস:

নবজাতকের প্রথম সপ্তাহে হয়ে থাকে।

 অনেক সময় বাচ্চা খাওয়ার জন্য মায়ের দুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে পায়না , সেক্ষেত্রে বাচ্চার শরীর ডিহাইড্রেট হয়ে যায় ,প্রস্রাব ,মল ত্যাগ কম হয় ,সেক্ষেত্রে এটি হয়।মাকে প্রচুর পরিমাণে জল ,দুধ ,পুষ্টিকর খাদ্য খেতে হবে।বারে বারে বাচ্চাকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে।মায়ের দুধ  বৃদ্ধির জন্য মাকে খাওয়ান জল ,দুধ , যেসব খাবার বা  ওষুধ খেলে  মায়ের দুধ বৃদ্ধি পায়  সেদিকে খেয়াল করতে হবে। এছাড়াও মায়ের দুধে এক প্রকার এনজাইম থাকে সেখান থেকেই এই জন্ডিস হয়।

প্যাথলজিকাল জন্ডিস:

হাসপাতাল বা নার্সিংহোম থেকে নর্মাল  বা সিজার বাচ্চা জন্মানোর পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার পর বাচ্চার জন্মের ২৪ঘণ্টা বা ১দিনের মধ্যে যদি বাচ্চার সারা শরীর এবং চোখ হলুদ হয়ে যায়। একে বলে প্যাথলজিক্যাল জন্ডিস।এটা ভয়ের কারণ হতে পারে। এক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

নোলাইটিক জন্ডিস:

১) মায়ের পূর্ববর্তী কোনো বাচ্চা থাকলে, তার জন্ডিস হয়েছিল কিনা? হলে, কত দিনের মধ্যে হয়েছিল?

 ২)মায়ের পূর্ববর্তী মিস ক্যারেজ বা অ্যাবর্শন হয়েছিল কিনা।

৩)মায়ের ব্লাড গ্রুপ নেগেটিভ  (Rh-) কিনা  , মায়ের ব্লাডগ্রপ ( A- ,  B- , O-  ,AB -) নেগেটিভ হলে বাচ্চার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে,একে বলে মনোলাইটিক জন্ডিস।

৪) পূর্ববর্তী মাকে অ্যান্টি Rh D ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল কিনা।

 বাচ্চার জন্ডিসের উপরোক্ত কারণ গুলি হল মনোলইটিক জন্ডিসের কারণ।

সার্জিক্যাল জন্ডিস:

  বাচ্চার প্রস্রাব এবং মলের রঙের যদি পরিবর্তন হয় তাহলে বুঝতে হবে বাচ্চাটির সার্জিক্যাল জন্ডিস হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রস্রাবের রঙ হাই বা ডার্ক কালার এবং প্রস্রাবের দাগ হলে ন্যাপিতে ধরে রাখছে কিনা।  মলের রং হাল্কা ফ্যাকাসে , সাদাটে , হলদেটে বা ধূসর রঙের হচ্ছে কিনা।

সাধারণত বাচ্চা জন্মের ২-৪দিন  কালো সবুজেটে ভাবের মলত্যাগ করে একে মিকোনিয়াম বলে। খেয়াল রাখতে হবে যে , বাচ্চার স্বাভাবিক মলের রঙের বদল হচ্ছে কিনা।মলের রঙ যদি ফ্যাকাসে বা সাদাটে হয় তাহলে বাচ্চাটির সার্জিক্যাল জন্ডিস হয়েছে।

ধূসর রঙের মল এবং কালো রঙের প্রস্রাবের সাথে জন্ডিস একসাথে জড়িত।বাচ্চা জন্মানোর পর জন্মগত সমস্যা বা ত্রুটিনিয়ে জন্মালে তখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন পড়তে পারে। একে সার্জিক্যাল জন্ডিস বলে।

ধূসর রঙের মল এবং কালো প্রস্রাবের রং দেখলে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।অনেক সময় বাচ্চার সমস্ত অ্যাকটিভিটি ভালো থাকে , ভালো খায় , তা সত্ত্বেও  বাচ্চার ধূসর রঙের মল এবং কালো রঙের প্রস্রাব হয়। 

নবজাতকের জন্ডিস
নবজাতকের জন্ডিস

বাচ্চার জন্ডিসে ক্ষতির কারণ গুলো কি কি ?

 বাচ্চার লিভার এবং লিভার থেকে পিত্ত বেরোনোর যে স্বাভাবিক নল, যেটা দিয়ে বিলিরুবিন বেরোয়। জন্মগত ত্রুটির কারণে নলের মুখ বন্ধ হয়ে যায় বা বিলিরুবিন বের হতে বাধা প্রাপ্ত হয়। প্রস্রাব বা মলের দ্বারা শরীর থেকে বেরোতে পারেনা। 

সে ক্ষেত্রে বিলিরুবিন জমতে থাকে ,সেটা জমতে জমতে ব্লাডব্রেইন বেরিয়ার এর মাত্রা ছাড়িয়ে যায়।ফলত মাথার কিছু গুরুত্ত্বপূর্ণ জায়গায় বিলিরুবিনটা জমতে থাকে। তখন পার্মানেন্ট ক্ষতি হতে শুরু করে ,যাকে কারমিনটেরাস বলে।এই কারমিনটেরাস হলে বাচ্চা পঙ্গু হয়ে যেতে পারে।  বাচ্চার মস্তিষ্ক এবং শ্রবণ শক্তিতে ক্ষতি হয় তাতে বাচ্চা চিরকালীন  শ্রবণশক্তি হারাতে পারে। এমনকি বাচ্চার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

সার্জিক্যাল অপারেশনের প্রয়োজন কেন পড়ে ?

বাচ্চার জন্ডিসের সাথে অন্য যেসব কারণ গুলির জন্য দ্রুত ডাক্তারের অপারেশনের প্রয়োজন বোধ করে সেগুলি হল

১)বাচ্চার ব্লাড গ্রুপ (Rh-) ধরনের হলে জন্ডিস হতে পারে।

২)জন্মের পর বাচ্চার ইনফেকশন থাকলে জন্ডি হয়।

৩)জন্মের সময় মাথায় চোট পেলে দেরিতে কাঁদে যাকে বলে বার্থ আফেকসিয়া। সেটা থাকলে জন্ডিস হয়।

৪)জন্মগত হার্টের সমস্যা , কিডনির সমস্যা , আয়রনের তারতম্য , বাচ্চার ইনফেকশন থাকলে, ডায়াবেটিক মায়ের কারণে বাচ্চার সুগারের মাত্রা কম থাকলে বাচ্চার জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। 

 সার্জিক্যাল জন্ডিসের চিকিৎসা

  জন্ডিসের সাথে বাচ্চার জন্মগত অন্য কোনো ত্রুটি বা সমস্যা থাকলে সার্জিক্যাল জন্ডিসের চিকিৎসা করা হয়।

এক্ষেত্রে কয়েকটি পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয় তার মধ্যে একটা হল ফটোথেরাপি।এটাতে বাচ্চাকে একটি ছোটো  চৌকোনো কাঁচ বন্দি ঘরে বাচ্চাকে চোখ এবং যৌনাঙ্গ কাপড় দিয়ে ঢেকে  ব্লুলাইটের আলোতে রাখা হয়।এগুলি  সংবেদনশীল জায়গা ব্লুলাইটের আলোতে ক্ষতি হতে পারে তাই এই ব্যবস্থা।এবং থেরাপি চলাকালীন বাচ্চার ডিহাইড্রেশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই বাচ্চাকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হয়।এই থেরাপির ফলে বাচ্চার দেহে অতিরিক্ত বিলিরুবিন পায়খানা এবং প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়।

 এছাড়াও কিছু ড্রাগ দিয়ে বাচ্চার চিকিৎসা করা হয়।

 প্রথম দুই পদ্ধতিতে কাজ না করলে এবং যখন বাচ্চার জন্ডিসের মাত্রা অধিক পরিমাণে  বেড়ে যায় তখন এক্সচেঞ্জট্রান্সফিউশন অপারেশন করা হয়। এখানে বাচ্চার রক্ত পাল্টে ফেলা হয়। তবে এটি বেশ ঝুঁকি পূর্ণ।অনেক সময় বাচ্চার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

নবজাতকের জন্ডিস কে কোনো ভাবেই হালকা ভাবে নেবেন না বা অবহেলা করবেন না।নবজাতকের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই নবজাতকের জন্ডিস হলে যতদ্রুত সম্ভব শিশু-ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

গর্ভকালীনজন্ডিস

গর্ভাবস্থায় টেস্টের মাধম্যে যদি মায়ের জন্ডিস ধরা পড়ে তাহলে মাকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।কতগুলি কারণে গর্ভবতী মায়েদের এই জন্ডিস হয়ে থাকে।

বাচ্চার প্লাসেন্টা থেকে যে সব দূষিত পদার্থ বের হয় সেগুলি পরিবর্তন পরিশোধন করে থাকে বাচ্চার গভাবস্থায় থাকাকালীন মায়ের লিভার। এছাড়াও মা যেসব কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন , ফ্যাট খাদ্য গ্রহণ করে ,সেগুলি  বিপাক ক্রিয়ার ফলে লিভারে জমা হয়।কোনো কারণে যদি লিভারের ইনফেকশন হয় বা অ্যানিমিয়া বা উপযুক্ত প্রোটিনের অভাব লিভারের কোষের কাজ ব্যাহত হয় ,তখন বিলিরুবিনের স্বাভাবিক পরিশোধন ব্যাহত হয়। তখন বিলিরুবিন রক্তে জমে এবং জন্ডিস হয় ,তাকে গর্ভকালীন জন্ডিস বলে।

১)গর্ভাবস্থার  প্রথম দিকে  মায়ের অতিরিক্ত বমি হাওয়াতে ডিহাইড্রেশন হয় , সেক্ষেত্রে লিভারের কাজ ব্যাহত হয়ে জন্ডিস হতে পারে।

২)উচ্চ রক্তচাপ থাকলে,লিভার ক্ষতি গ্রস্ত হয় জন্ডিস হতে পারে।

৩)অ্যাকিউট ফ্যাটিলিভার থাকলে জন্ডিস হতে পারে।

৪)কোনো মায়ের গলব্লাডার স্টোন , হেপাটাইটিস A,B ,C,E তে আক্রান্ত হলে জন্ডিস হয়।

৫)লিভার এর সমস্যা যেমনঃ লিভারসিয়োসিস , হেপাটাইটিস a b c e এগুলো দিয়ে হয়ে থাকে।

গর্ভাবস্থায় কি করে বুঝবেন জন্ডিস হয়েছে ?

গর্ভাবস্থায় মায়ের জন্ডিস হয়েছে এটা বোঝার জন্য লক্ষ্য রাখতে হবে : চোখ প্রস্রাবের রঙ হলুদ হবে , বমি বমি ভাব , খিদে না পাওয়া ,পেটেব্যথা , গ্যাসঅম্বল, পেটে-বুকে জ্বালা , দুর্বলভাব এগুলি প্রাথমিক পর্যায়ে হয়ে থাকে। তবে জন্ডিসের মাত্রা বেশি হলে সারা শরীরের ত্বক হলুদ হয়ে যায়।

গর্ভাবস্থায় মায়ের জন্ডিস হলে কি হতে পারে ?

(১) লিভারের কোষের বিশেষ ক্ষতির ফলে মা কোমায় চলে যেতে পারে, এমনকি প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকে।

(২)গর্ভাবস্থায় জন্ডিস থাকলে লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্থ হলে , রক্তজমাট বাঁধতে পারে না এবং বাচ্চা  জন্ম দেয়ার পর প্রসূতির অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হয়, তাতে মায়ের মৃত্যুর ঝুঁকি হতে পারে।

লিভার বা যকৃতকে আমাদের শরীরের রান্না ঘর বলা হয়। আমাদের শরীরে লিভার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।লিভারের স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির প্রভাব আমাদের সারা শরীরে পড়ে। তাই লিভার যাতে ঠিক ঠাক থাকে ,সেই মত আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং লিভার ক্ষতি গ্রস্ত হলে তার সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে। জন্ডিস শুধু রোগের লক্ষণ মাত্র।সঠিক চিকিৎসা এবং পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিলে শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে।গর্ভকালীন জন্ডিস এবং নবজাতকের জন্ডিসের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

তথ্যসূত্র 

গুগল ,উইকিপিডিয়া, ফেসবুক , ইউটিউবওঅন্যান্য