ক্যান্সার

ক্যান্সার কি ?

 ক্যান্সার  মানেই কি মৃত্যু ?

ক্যান্সার কি ?
ক্যান্সার কি ?

Cancer Has No Answerএইধারণা আজ মৃত , শুধুমানসিক  লড়াইয়ের জোর থাকতে হবে।

“I Am and I Will.” (৪ঠাফেব্রুয়ারী ,২০২০) বিশ্বজুড়ে ক্যান্সার সচেতনতায় এইস্লোগান ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রতিটি কোণায় কোণায়।একবিংশ শতকের উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর আশ্বাস রাখলে ক্যান্সার জয় অনেকাংশে নিশ্চিত।

ক্যান্সার মানেই অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু ,জীবনশেষ ! ভ্রান্তধারণা কিভাবে বেরিয়ে এসে ক্যান্সারকে কিভাবে লড়াই করে হারাবেন ,এই রণকৌশল এইনিবন্ধের আলোচ্য বিষয়।তারসাথে সম্পূর্ণ ক্যান্সার সম্মন্ধে একটা আইডিয়া এইনিবন্ধে আছে।

  • ক্যান্সার রোগ আসলে কি ? ( What is cancer ?)
  • বিভিন্ন রকম ক্যান্সার রোগের নামকরণ। ( Naming of cancer Bangla)
  • কতধরনের ক্যান্সার হয় ? (Types of Cancer in Bengali)
  • ক্যান্সারের উপসর্গ গুলি কি কি ? (Symptoms of Cancer in Bengali)
  • ক্যান্সার রোগে কোন চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় ?  (Treatment of Cancer in Bangla)
  • ক্যান্সার রোগ কিভাবে  নির্ণয় করা হয় ? (Diagnosis of Cancer in Bangla)
  • ক্যান্সার মানেই কি মৃত্যু ? ( what the meaning of cancer is death ? )
  • ক্যান্সারে আক্রান্ত মহিলারা কি সন্তানধারণ করতে পারবেন ? (can conceive the cancer effected women ?)
  • ক্যান্সার প্রতিরোধ করবেন কিভাবে ? (How to prevent cancer ?)

ক্যান্সার রোগ আসলে কি ?

অসংখ্য  ছোটো ছোট বিভাজিত কোষের সমন্বয়ে বিশ্বের সমস্তপ্রাণীর শরীর তৈরী হয়। বৃদ্ধকোষের মৃত্যুর সাথে নিয়ন্ত্রিত ও বিভাজিত হয়ে নতুন  কোষের জন্ম,এইভাবেই কোষেরসৃষ্টি – বৃদ্ধি – ধ্বংস  চলতে থাকে।কোষের এই স্বাভাবিক নিয়মে  প্রাণীর শরীরের জন্ম ,  বৃদ্ধি এবং আয়ুষ্কাল ফুরোলে মৃত্যু হয়। 

 স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে যখন বিভাজিত কোষগুলি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে বাড়তে থাকে ,তখন অনেক গুলি কোষ জমে মাংসের দলা পাকিয়ে ত্বকের নীচে জমতে থাকে, একে টিউমার বলে।  টিউমার দু’ধরনের হয় বি-নাইন টিউমারএবং

ম্যালিগন্যান্ট টিউমার।ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই হল‌ ক্যান্সার। 

মেটাস্ট্যাসিস  বাস্থানান্তর হলো ক্যান্সারের একটি পর্যায়, যাতে ক্যান্সার কোষগুলি অন্যান্য কলাকে ভেদ করে ও রক্ত, লসিকাতন্ত্রের  ইত্যাদির মাধ্যমে পাশাপাশি এবং দূরবর্তী কলায় ছড়িয়ে যায়। 

ক্যান্সারের নামকরণ করা হয় কি ভাবে ?

সংস্কৃতভাষায় কর্কট মানে কাঁকড়া।দেহের যে অংশে  ক্যান্সারে আক্রান্ত , সেই স্থানীয় কোষগুলির মধ্যে ম্যালিগ্ন্যান্ট টিউমার এ পরিণত হয়।এটি অনেকটা শুঁড়ের মত মাইক্রোমেটাস্টাসিস সম্প্রসারিত করে তখন তাকে দেখতে অনেকটা দাঁড়-ওয়ালা কাঁকড়ার মত দেখায় একে ক্যান্সার বলা হয় , ক্যান্সার মানে কাঁকড়া।

প্রায় ২০০প্রকারেরও বেশি ক্যান্সার আছে। এবং এত প্রকার  ক্যান্সারের  নাম আলাদা করে মনে রাখা সত্যিই কষ্ট কর।তাই ওমা-প্রত্যয় , নোমা-প্রত্যয় , মা-প্রত্যয় প্রভৃতি যোগকরে ক্যান্সারের নামকরণ হয়।

 আবরণীকোষে সৃষ্টক্যান্সার মাপ্রত্যয় যোগে

যেমন কার্সিনোমা (মা-প্রত্যয়) ।

ক্যান্সারের নামকরণ শরীরের অঙ্গ-পতঙ্গের নামের ওপর ভিত্তি করে ক্যান্সারের নামকরণ করা হয়।নামকরণের প্রথমাংশে থাকে ক্যান্সার আক্রান্ত অঙ্গ বা কলার নামের লাতিন বা গ্রিকশব্দ যেমন যকৃতের ক্যান্সার  ।প্যারেনকাইমায় ম্যালিগন্যান্ট এপিথেলিয়াল কোষ থেকে সৃষ্ট্য কৃতের ক্যান্সারের নাম হচ্ছে হেপাটো কার্সিনোমা।হেপাটো = যকৃত  , কর্সিমা = আবরণী বা এপিথেলিয়াল কোষ থেকে সৃষ্ট। 

বিশ্বের সব চেয়ে ভয়ানক রোগ হল ক্যান্সার। সঠিক কারণ এবং কার্যকারী ওষুধ আজও গবেষণা রত।এই রোগে মৃত্যুরহার সবচেয়ে বেশি ,তবে ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়।প্রাথমিক পর্যায়ে ধরাপড়লে চিকিৎসার দ্বারা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া যায় , অনেক ক্ষেত্রেই নিঃশব্ধে মারণ থাবা বসিয়ে রাখে ফলে শেষ পর্যায়ে  চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা দূর হসাধ্য  হয়েপড়ে।

প্রায় ২০০প্রকারের বেশি ক্যান্সার আছে , এবং সবার ক্ষেত্রে চিকিৎসা পদ্ধতি আলাদা।

ক্যান্সার রোগের কারণ গুলি কি কি ?

ভারতে অধিক মাত্রায় যে ধরণের ক্যান্সারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ,তারমধ্যে প্রথমেই আছে

 গ্যাসট্রোইন্টেসটিনালট্র্যাক্ট এবং স্তন ক্যানসারের পরিমাণ। পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, মুখ, পাকস্থলী এবং ইসোফেগাসের ক্যান্সার বেশি দেখা যাচ্ছে ।

মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন এবং সার্ভিক্স-ইউটেরির ক্যান্সারে আক্রান্ত অধিক দেখা যাচ্ছে ।

মোট ক্যান্সার আক্রান্তের নিরিখে দেশে মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যানসার আক্রান্ত প্রায় ২লক্ষ।

ক্যান্সার রোগের কারণ গুলি কি কি ?
ক্যান্সার রোগের কারণ গুলি কি কি ?

 কথায় আছেনা ,কারণ ছাড়া কার্য সম্পন্ন হয় না।এক্ষেত্রেও ঠিক তাই। ক্যান্সার রোগে যদিও নিশ্চিত করে কারণ বলা যায়না , তবুও কিছু কিছু কারণ থেকেই যায় , যা থেকে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলি হল :

  •  অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাত্রা, খাদ্যাভাসের আমূল পরিবর্তন।বাইরের খাবারের প্রতি অর্থাৎ ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্তি। 
  • অতিরিক্ত মেদ-বহুল শরীর ক্যান্সার রোগ ডেকে আনার একটি কারণ হতে পারে।
  • মাতৃদুগ্ধ পান না করানো ,সময়ের আগে ঋতুচক্র এটি ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

ক্যান্সার রোগে কি কি  চিকিৎসা করা হয় ?

 ক্যান্সার রোগে ক্যান্সার কোষ শরীরের কতটা স্থান জুড়ে বিস্তার লাভ করেছে ,তার উপর ভিত্তি করে সে মত তিন ভাবে  চিকিৎসা  করা হয়।

কেমো-থেরাপি

কেমোথেরাপি হচ্ছে এক ধরণের বিষ ,সাইটো টক্সিক কেমিক্যাল এর দ্বারা ক্যান্সারের কোষ ধ্বংস করা হয়।

এটি দ্বারা  শরীরের ক্ষতিকারক ক্যান্সার কোষ গুলোকে যতটা সম্ভব খুঁজে বেরকরে ধ্বংস করে এবং ভালো কোষ গুলোকে যতটা সম্ভব কম ধ্বংস করে।

কেমোথেরাপি  দেওয়া হয় –  ইনজেকশনের মাধ্যমে কেমোথেরাপি শিরায় প্রবেশ করানো হয়।

এছড়াও স্যালাইন এর মত করেও কেমোথেরাপি দেয়া হয়। এছাড়াও ট্যাবলেটের মাধ্যমে রোগীকে দেওয়া হয়ে থাকে।

ক্যান্সারের কোষ দ্রুত ছড়াতে থাকে ,কেমোথেরাপি এই দ্রুতবর্ধনশীল ক্যান্সার কোষকে আক্রমণ করে, তার সাথে  ভালো কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনাও থাকে।

কেমো-থেরাপি চলাকালীন  চুলপড়ে যায়। এটা নারী হোক বা পুরুষ দু’জনারই কষ্টের বিষয়।বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে , নারীরা মনে করেন সব সৌন্দর্যই বুঝি হারিয়ে ফেলবে চির তরে। কিন্তু  কেমোথেরাপি শেষ হবার পর চুল পুনরায় গজিয়ে উঠে।শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ডায়রিয়া হতে পারে। প্রচণ্ডভাবে শারীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে।এছাড়াও নারী এবং পুরুষের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে , শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু জমে যেতে পারে।

রেডিয়েশন থেরাপি

 এক্সরে বা গামা রশ্মি (RT, RTx, or XRT)

 ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে এবং কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজন ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া হয়।

ক্যান্সার কোষ নষ্ট করার সাথে সাথে আবরণী কলার কোষ ও অন্যান্য স্বাভাবিক কোষও নষ্ট করে দেয়।এছাড়াও রেডিও থেরাপির ফলে থাইরয়েড গ্রন্থির কোষ অবস্থান চ্যুত বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে রেডিয়েশনথেরাপি শরীরের যে অঙ্গে দেওয়া হয় ,সেই অঙ্গের সংশ্লিষ্ট অংশে সমস্যা দেখা দেয় –

  • কোনও ব্যক্তির মাথা বা ঘাড়ে রেডিয়েশনথেরাপির দিলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বরূপ : শুষ্কমুখ, মুখ এবং মাড়ির ঘা , গিলতে অসুবিধা, চোয়ালের কড়া ,বমি বমি ভাব , চুলপরা , ,দাঁতের ক্ষয় প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • বক্ষদেশে  রেডিয়েশনথেরাপির ফলে  : গিলতে অসুবিধা , নিঃশ্বাসের দুর্বলতা , স্তন বা স্তনবৃন্তের ব্যথা , কাঁধে কড়া ,কাশি, জ্বর প্রভৃতি সমস্যা দেখা দেয়।
  • পেটে রেডিয়েশনথেরাপি দিলে –  ক্ষুধামান্দ্য ,বমি বমি ভাব এবং বমি , অন্ত্রের বাধা ,আলগা মল বা ডায়রিয়ার মত সমস্যা দেখা দেয়।
  • পেলভিস এলাকায় রেডিয়েশনথেরাপির ফলে: আলগা মল বা ডায়রিয়া ,মলদ্বারে রক্তক্ষরণ ,মূত্রাশয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়না , মূত্রাশয়ে জ্বালা , পুরুষদের জন্য যৌন সমস্যা , মহিলাদের যোনিতে চুলকানি, জ্বলন, শুষ্কতা এবং মহিলাদের উভয় ডিম্বাশয় যদি রেডিয়েশনথেরাপির ফলে বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে। 

সার্জারি

প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে সার্জারি বা অস্ত্রোপচার করা হয়। শরীরের অল্প জায়গা জুড়ে ক্যান্সার হলে ,ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলি এবং তার আশে পাশের কোষ গুলিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কেটে বাদ দেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।

 ক্যান্সার রোগীরা কি কখনো মা হতে পারবেন?

প্রথমেই সমস্ত ক্যান্সার রোগী যারা মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে চান ,ওনাদের আশ্বত্ব করে বলছি অবশ্যই পারবেন।ক্যান্সারের চিকিৎসা শেষ করে ৬মাস বা এক বছরের মধ্যে কনসিভ করতে পারবেন। তবে এটা নির্ভর করে শরীরের কোন স্থান ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং ক্যান্সারের কোষ গুলি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তার ওপর। 

মূলত মহিলাদের ক্ষেত্রে ব্রেস্ট ক্যান্সার এবং সারভাইক্যাল ক্যান্সার বেশি দেখা যায়। এছাড়া রেকটাম, লাং এবং কোলন ক্যান্সারও দেখা যায়।

ক্যান্সারের প্রকারভেদ :

 ক্যান্সার প্রধানত পাঁচ প্রকারের হয় –

(১) কার্সিনোমা: প্রাণীদেহের আবরণী কলা থেকে কার্সিনোমা ক্যান্সার হয়।মানব দেহের ব্রেস্ট প্রোস্টেট, ফুসফুস, অগ্ন্যাশয়, এবং মলাশয় এই সমস্ত অঙ্গগুলি আবরণী কলা দিয়ে তৈরি। যেসব ক্যান্সার হয়  তার প্রায়সব-ইকার্সিনোমাক্যান্সারেরঅন্তর্ভুক্ত।

(২) সারকোমা: প্রাণীদেহ যোজক কলার  সমন্বয়ে গঠিত অঙ্গপতঙ্গ যেমন হাড় , তরুণাস্থি , চর্বি ,স্নায়ুর মধ্যে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই এই ক্যান্সারের মূলকারণ। সারকোমা  প্রাথমিক ভাবে এটি শনাক্ত করা গেলে এর চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়। কিন্তু যদি মেটাস্ট্যাটিক স্টেজে শনাক্ত করা হয়ে থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে বেঁচেথাকার সম্ভাবনা খুবই কম।

সারকোমা ক্যান্সার  2 ধরনের হয়

-(ক) বোন বা হাড়ের সারকোমা এবং (খ) সফট টিস্যু সারকোমা। এই দুটিরই বিভিন্ন সাব টাইপ আছে।

(৩) লিম্ফোমা ও লিউকোমিয়া: শ্বেত কণিকার মাত্রা অধিক বেড়ে যাওয়ার ফলে ব্লাড ক্যান্সার লিউকোমিয়া হয়।সাধারণত শিশুদের মধ্যে এই রোগের আধিক্য অধিক।

দানা বিহীন শ্বেত কণিকা লিম্ফো সাইটের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি । সাধারণত শ্বেত কণিকার গড় আয়ুষ্কাল ১০-১২ দিন। বৃদ্ধ শ্বেত কণিকার ধ্বংস হয়ে নতুন শ্বেত কণিকা সৃষ্টি হয়।কিন্তু সময়ের আগে ,শ্বেতকণিকা মৃত্যু না হাওয়া সত্ত্বেও কণিকার অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের ফলে লিম্ফোমা ক্যান্সার হয়।

 ক্যান্সার এর প্রকারভেদ , Types of cancer.
ক্যান্সার এর প্রকারভেদ

(৪) জার্মসেলটিউমার:   প্রজননের ক্ষেত্রে গর্ভস্থ শিশু মাতৃজঠরের জরায়ুর মধ্যে থাকে।ডিম্বাশয়ে ডিম এবং শুক্রাণু মিলে একটি শিশু তৈরী হয়।কোনো কারণ বশত ডিম এবং শুক্রাণুর সংমিশ্রণে কোষটি টিউমারে পরিণত হয় ,যাকে gonadal germ cell টিউমার বলা হয়।এটি বি-নাইন টিউমারও হতে পারে , আবার ম্যালিগন্যান্ট টিউমারও হতে পারে।যদিও জার্মসেল প্রধানত প্রজনন অঙ্গ ,তবুও শরীরের অন্যান্য অংশে হয়ে থাকে ,যাকে extragonadal germ cell টিউমার বলে।এটি খুবই বিরল প্রজাতির ক্যান্সার। যেটি শিশু এবং কৈশোরে দেখা যায়।

(৫) ব্লাস্টমা:    ভ্রূণের প্রিকারসার কোষ ,যেকোষ থেকে প্রাণীর দেহ তৈরী হয়।ব্লাস্টমা ক্যান্সার হলে এই প্রিকারসার কোষ গুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ম্যালিগন্যানসিয়াস প্রিকারসার কোষের জন্য ব্লাস্টমক্যান্সার হয়ে থাকে।যেটিকে ব্লাস্টমা বলা হয়। শরীরের যে অংশে ব্লাস্টমা হয় ,সে অনুযায়ী নাম হয় যেমন কিডনিতে হলে নেফ্রোব্লাস্টমা ,চোখে হলে রেটিনাব্লাস্টমা ইত্যাদি।

এটি শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

কি করে বুঝবেন যে আপনি ক্যান্সারে আক্রান্ত ?

ক্যান্সার শরীরের যেকোনো অঙ্গে হতে পারে। তাই প্রত্যেকটি ক্যান্সারের উপসর্গ আলাদা আলাদা হয়ে থাকে।ক্যান্সারের সঠিক কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি, অনেক ক্যান্সার শনাক্ত করার আগে ভয়ানক আকার ধারণ করে।তাই ক্যান্সারের প্রাথমিক উপসর্গ অনেক ক্ষেত্রে বোঝা যায়না।তবুও সাধারণ কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে , যাথেকে ডাক্তার বাবুরা ক্যান্সার রোগ সমন্ধে একটা ধারণা পেয়ে থাকেন ,যেটা থেকে পরবর্তী কালে নিশ্চিত ভাবে ক্যান্সার রোগ সুনিশ্চিত করা যায়। যেমন:

  • খুব ক্লান্ত বোধ করা ।
  • খিদে কমে যাওয়া
  • শরীরের ত্বকের নীচে মাংসের দলা দেখা দেয় ।
  • দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা গলার আওয়াজ ভাঙা ভাঙ্গা হয়ে যায় ।
  • ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা মলের সাথে রক্ত আসা।
  • অকারণে  জ্বর আসা , রাতের দিকে ঠান্ডা লাগা বা ঘেমে যাওয়া ।
  • অস্বাভাবিক ভাবে ওজন কমে যাওয়া 
  •  মহিলাদের ক্ষেত্রে  অস্বাভাবিক রক্তপাত হওয়া
  • ত্বকে পরিবর্তন দেখা যাওয়া , চুলকানি ,ফুসকুড়ি ,ত্বকের রং এর পরিবর্তন ।
  • সব সময় একটা মানসিক অস্বস্তি লেগে থাকা  ইত্যাদি।

ক্যান্সারের চিকিৎসা পদ্ধতি নিৰ্ণয় :

ক্যান্সারের চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা।দীর্ঘমেয়াদী এইরোগটি গ্রেডিং ও স্টেজিং এই দুটি পদ্ধতিতে ভাগ করে ক্যান্সারের চিকিৎসা করা যায়।গ্রেডিং পদ্ধতিটিকে গ্লিসান স্কোর বলে ,এই পদ্ধতিতে ১থেকে১০টি গ্রেড আছে।

গ্রেডিং :

কোনও ক্যান্সারের গ্রেড নির্ধারণের জন্য আক্রান্ত অংশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ।

ক্যান্সারে আক্রান্ত কোষ গুলির মধ্যে বেশি আক্রান্ত হওয়ার স্থানে বা গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থানের নমুনার ভিত্তিতে স্কোর নেওয়া হয়  ।সেই স্কোর দুটির যোগফলের ভিত্তিতে ক্যান্সার রোগটি প্রাথমিক স্টেজে আছে না বিপদজনক স্থানে আছে  বোঝাযায়। ১-৫এর নম্বর দেওয়া হয় ,যাদের যোগফল হল ক্যান্সারের স্কোর এবং পূর্ণমান ১০নম্বর।          

গ্লিসান স্কোরঝুঁকিবিপদের আশঙ্কা
গ্লিসান স্কোর: ২ – ৪কমআগ্রাসনের ক্ষমতা খুব কম মাত্রার
গ্লিসান স্কোর: ৫ – ৬কমআগ্রাসনের ক্ষমতা খুব কম মাত্রার
গ্লিসান স্কোর: ৭মাঝারিআগ্রাসনের ক্ষমতা মধ্য মানের
গ্লিসান স্কোর: ৮ – ১০বেশিআগ্রাসনের ক্ষমতা অত্যন্ত তীব্র মাত্রার
গ্লিসান স্কোর

স্টেজ : 

গ্রেডিং স্কোরের উপর ভিত্তি করে ক্যান্সারের ভয়াবহতা এবং চিকিৎসা কতটা দীর্ঘমেয়াদী হবে তার স্টেজ নির্ণয় করা হয়।প্রথম ,দ্বিতীয় ,তৃতীয় এবং চতুর্থ এই চারটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় স্টেজের ক্যান্সার আক্রান্ত অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, এর বাইরে ছড়িয়ে পড়েনা। প্রথম স্টেজের টিউমারটি ছোটো  এবং দ্বিতীয়টি তুলনা মূলক ভাবে কিছুটা বড়।

ক্যান্সারের তৃতীয় স্টেজে টিউমারটি সাইজে বড় হতে হতে আক্রান্ত অংশকে ছাড়িয়ে যায়।এই ক্রম বর্ধমান টিউমারটি ছড়াতে ছড়াতে আক্রান্ত  অংশ ছেড়ে অন্য কোনও অঙ্গকে স্পর্শ করে ফেলে তখন সেটিকে চতুর্থ স্টেজের ক্যান্সার হিসেবে চিহ্নিত হয়।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া মানেই কি মৃত্যু ?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্যান্সার রোগীর মৃত্যু দেখে ক্যান্সার রোগ সমন্ধে আতঙ্কিত হওয়ায় স্বাভাবিক। ক্যান্সার মানেই মৃত্যু এটি সঠিকধারণা নয়।আসুন জেনে নেওয়া যাক ,ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে আসলে কি হয়।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে বাঁচার সম্ভাবনা ঠিক কতটা এটা সারভাইভাল রেটের উপর নির্ভর করে। এখন এই সারভাইভাল রেট কি ?ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হলে আক্রান্ত স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকে তার উপর ভিত্তি করে রোগী কতদিন বাঁচবে ,হিসাব কষে নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা দেওয়া হয়।ডাক্তারেরা নির্দিষ্ট করে বলে থাকেন এই ক্যান্সারের ২ ,৫ ,১০বছরের মধ্যে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৭০% ,কিম্বা ৮০%, কিম্বা ৬০% ইত্যাদি।

ক্যান্সারকত বছরের মধ্যেবেঁচেথাকার সম্ভাবনা (%)
ব্লাড ক্যান্সার৫,১০,১৫বছরেরমধ্যে৭৭%, ৭০% ও৬৫% ( তবে যদি৫বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে ,তাহলে ৯৫%) 
ব্রেস্ট ক্যান্সার ৫ , ১০বছর৯০% ও৮৩%  ( তবে যদি ৫বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে ,তাহলে ৯৯% ) 
কোলোরেক্টাল ক্যান্সার৫বছরের৯০% ( যদি শুধু ব্রেস্টেই সীমাবদ্ধ থাকে ) ৭১% ( যদি পাশের লিম্ফনোডে   ছড়িয়ে পড়ে ) ১৪% ( যদি দূরবর্তীস্থানে ছড়িয়ে পড়ে )
কিডনি ক্যান্সার৫ বছর৭৫% ( যদি শুধু কিডনিতেই সীমাবদ্ধ থাকে) ৬৯ % ( যদি লিম্ফনোডে ছড়িয়ে পড়ে ) ১২ % ( যদি দূরবর্তীস্থানে ছড়িয়ে পড়ে )
লাঙ ক্যান্সার ( non – small cell)  (Small cell lung cancer)৫বছর১৯% ১৬% ( পুরুষদের ক্ষেত্রে)  ২২% ( মহিলাদের ক্ষেত্রে )   ২৩% ( Non- small cell lung cancer)   ৬% (small – cell lung cancer )  
লিম্ফোমা  স্টেজ-1, স্টেজ -2, স্টেজ-3৫বছর৭১%   ৬৯% (পুরুষদের ক্ষেত্রে )  ,৭২% ( মহিলাদের ক্ষেত্রে ) ৮২% ৭৫% ৬৯ %
মেলানোমা৫বছর৯৮ % ৮০ % (মেলোনামা যদি ঘন হয়) ৬৪% ( লিম্ফনোডে ছড়িয়ে পড়লে) ২৩ % ( দূরবর্তীঅংশে ছড়িয়ে পড়লে )
ওরাল ও ওরোফ্যারেঞ্জিয়াল ক্যান্সার৫বছরে৬৫ % ৮৪ %  ( রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে) ৩৯% ( দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়লে )
প্যাংক্রিয়াটিক ক্যান্সার৫  বছরে৩৪ %  ১২ %  ( পার্শ্ববর্তী লিম্পনোডে‌ ছড়িয়ে পড়লে ) ৩% (দূরবর্তীস্থানেছড়িয়েপড়লে )
প্রস্টেট ক্যান্সার৫  বছরে১০০%  ৩০ % ( দূরবর্তীস্থানে ছড়িয়ে পড়লে )
থাইরয়েড ক্যান্সার৫বছর   ৯৮ %
ইউটেরাইনক্যান্সার ৫বছর ৮১ % ১৬%( শরীরের দূরবর্তী স্থানে ছড়িয়ে পড়লে )
সারভাইভাল রেটের

ক্যান্সার হাওয়া মানেই মৃত্যু এটাই একমাত্র অবশ্যম্ভাবী ভবিষৎ নয়।আমাদের দেশে মানুষদের মধ্যে রুটিন হেল্থচেকআপের প্রতি একটা অনীহা থেকেই জটিল রোগে বেশির ভাগ আক্রান্ত হয়।যদি বছরের দুবার রুটিন চেকআপ করে ফেলা যায় ,তাহলে অনেক জটিল রোগ ঠেকানো সম্ভব হয়, সাথে ক্যান্সার হলেও শনাক্ত করে ফেলা যায়।

 এছাড়াও কিছুটা ব্যয়বহুল হওয়ার জন্যও মানুষজন কিছুটা পিছিয়ে থাকে।ক্যান্সার কিন্তু একদিনে হয় না ,দীর্ঘদিন ধরে মানব শরীরে অল্প অল্প করে রসদ যুগিয়ে বাসা বাঁধে।তাই প্রথম দিকেই যদি ক্যান্সার শনাক্ত করে ফেলা যায় , সুস্থতার হার অধিক।ক্যান্সার শনাক্তে অনেক দেরী হয়ে যায় , তাই ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

ক্যান্সার প্রতিরোধ করবেন কিভাবে ?

ক্যান্সার যে একে বারে অপ্রতিরোধ্য এমনটা কিন্তু  নয়। সুস্থ থাকার ,রোগের হাত থেকে বাঁচার চাবিকাঠি আপনারই হাতে। নিজের শরীরের প্রতি যত্ননিন তাহলেই সম্ভব।

  • বর্তমান পাল্টে যাওয়া জীবন যাত্রা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হতেই হবে।
  • সঠিক ও পরিমিত , পুষ্টিকর খাদ্যভ্যাস তৈরি করতে হবে। 
  • নিয়মিত চেকআপ করতে পারলে খুবই ভালো।
  • তামাকজাত দ্রব্য ,অ্যালকোহল বর্জন করতে পারলে খুবই ভালো।
  • নাহলে কমপক্ষে অন্তত ৩০মিনিট জোরে জোরে হাঁটার অভ্যাস (শরীরে ঘাম আসতে হবে) গড়ে তুলতে হবে।

 সুস্থ থাকার জন্য ,ভালো থাকার জন্য এগুলো করলে ক্যান্সারের মত মারাত্বক রোগের পাশাপাশি অনেক জটিল রোগের হাত থেকে বাঁচা সম্ভব।

ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের জন্য সমানুভূতি প্রয়োজন। ক্যান্সার মানেই অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু এটা জেনেই রোগী হাল ছেড়ে দেয়।ডাক্তারের চিকিৎসার সাথে সাথে মানসিক জোর নাথাকলে কখনোই রোগকে জয় করা যাবেনা।ডাক্তারের চিকিৎসা পর পরিবার পরিজনের সাপোর্ট অত্যন্ত জরুরি।আপনার পরিবারে যদি কেউ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয় , তাকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মানসিক সাপোর্ট দেওয়া একমাত্র জরুরী।এছাড়াও আপনি যদি রোগী হয়ে থাকেন , কখনোই হাল ছেড়ে দেবেন না।আজকাল চিকিৎসা বিজ্ঞান যথেষ্ট উন্নত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মিরাকেল করার ক্ষমতা আছে , শুধু মনের লড়াই করার শক্তির দরকার। তাহলেই ক্যান্সারকে জয় করা যাবে।

তথ্যসূত্র

কোরা ,গুগল , উইকিপিডিয়া , one India Bengali , বিকাশপিডিয়াওঅন্যান্য